
মো. আনোয়ার হোসেন
রাজধানীর শ্যামপুরের দোলাইরপাড় উচ্চ বিদ্যালয় এখন এক মূর্তিমান অরাজকতার নাম। শিক্ষার আলো ছড়ানোর পবিত্র বিদ্যাপীঠটিকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. হারুন অর রশিদ মোল্লার বিরুদ্ধে। আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষকদের ওপর জুলুম এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। অথচ দুদকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগের পাহাড় জমা হলেও অলৌকিক ক্ষমতায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বৈষয়িকভাবে সন্তুষ্ট করে তিনি এখনো বহাল তবিয়তে।
একজন বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বেতন কত? সাধারণ হিসেবে যা হওয়ার কথা, তার সঙ্গে হারুন অর রশিদের জীবনযাত্রার কোনো মিল নেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা ও এর আশেপাশে তার প্রায় ১৪ কোটি ৬০ লক্ষ টাকার স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ১৪ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে কেয়ারী নগরে ১৩০০ ও ১৬০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট এবং মুরাদপুর হাই স্কুল রোডে ১২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, কেয়ারী নগরের ‘একতা টাওয়ার’-এ ৩টি ফ্ল্যাট (প্রতিটি ১৪০০ বর্গফুট) এবং মিরপুর সেনপাড়ায় ৫ কাঠার প্লটের ওপর একটি ১০ তলা নির্মাণাধীন ভবন (মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা), জুরাইনের বিক্রমপুর প্লাজায় ২টি বাণিজ্যিক দোকান, মাতুয়াইল মৌজায় ৪ কাঠার প্লটে একটি ফ্ল্যাট এবং কেরানীগঞ্জে ৯ কাঠা জমি রয়েছে। একজন হাই স্কুলের শিক্ষকের পক্ষে বৈধ আয় দিয়ে এত সম্পদের মালিক হওয়া অসম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ সালে হারুন অর রশিদ যখন প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান, তখন সরকারি বিধির তোয়াক্কা করা হয়নি। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছিল মাত্র একটিতে। তৎকালীন বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রভাবে কোনো নিয়মনীতির অনুসরণ না করেই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালের যে কমিটি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলছে, সেই কমিটির মাধ্যমেই তিনি নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। একজন খণ্ডকালীন শিক্ষককে বিধি বহির্ভূতভাবে শিক্ষক প্রতিনিধি বানিয়ে তিনি গঠন করেছেন এক পকেট কমিটি।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার গুণগত মান এখন তলানিতে। যোগ্য শিক্ষকদের কোণঠাঁসা করে প্রধান শিক্ষক তার অনুগতদের দিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন। অবাক করার মতো তথ্য হলো, এখানে ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষককে দিয়ে দশম শ্রেণিতে ইংরেজি পড়ানো হচ্ছে! এছাড়া সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ৬ পিরিয়ডের পরিবর্তে ৭ পিরিয়ডের ক্লাস রুটিন করা হয়েছে, শুধুমাত্র তার নিয়োগকৃত ৩০ জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে সুবিধা দেওয়ার জন্য। এমনকি একজন কেরানিকে কৌশলে শিক্ষক বানিয়ে তিন জায়গা থেকে বেতন পাইয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছে। প্রধান শিক্ষকের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অনেক শিক্ষক মানবেতর জীবন যাপন করছেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন থাকার পরেও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে না। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ বকেয়া পাওনা আটকে রাখা হয়েছে। অনেক শিক্ষক নিয়মিত স্কুলে হাজিরা দিলেও তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে রাখা হয়েছে, যা চরম অমানবিক। ২০১২ সালের প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হলেও তার কোনো হিসাব নেই। অভিযোগ আছে, এই অর্থের সিংহভাগই প্রধান শিক্ষকের পকেটে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বারবার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরেও কেন এই দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
দোলাইরপাড় উচ্চ বিদ্যালয়কে এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং হারুন অর রশিদের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন এলাকাবাসী। প্রশাসন কি এবারও নিশ্চুপ থাকবে, নাকি শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দোলাইরপাড় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হারুন অর রশিদ মোল্লার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য প্রদানে রাজি হননি। এমনকি তার বিপুল সম্পদের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি এড়িয়ে যান।