
বিশেষ অনুসন্ধান | ক্রাইম সিন ইউনিট মিডিয়া সেল ক্রাইম এলার্ট! এস এম রুবেল, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক
চাঁপাইনবাবগঞ্জ | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রেসক্রিপশনে ‘ডা. এমডি. ফিরোজ কবির’, যোগ্যতায় D.M.F—রামচন্দ্রপুরে চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ২৪ বছর ধরে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার মালিক
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর হাটে চিকিৎসাসেবা ও প্রেসক্রিপশন লেখাকে কেন্দ্র করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন টিমের প্রায় তিন মাসের অনুসন্ধান, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও ধারণ করা ভিডিওচিত্রে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত একটি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে! অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া যায়, নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্থানীয় রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন ফিরোজ কবির। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন এবং রোগীপ্রতি প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ভিজিট নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানের সময় পাওয়া একটি প্রেসক্রিপশনে নামের সঙ্গে “DR. MD. FIROZ KABIR” এবং যোগ্যতা হিসেবে “D.M.F (General Practitioner)”, রেজিস্ট্রেশন নম্বর 2021004 এবং কর্মস্থল হিসেবে Jahanara Pharmacy, Ramchandrapur Hat, Chapai Nawabganj উল্লেখ রয়েছে এবং তিনি ডা. বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই যোগ্যতা ও নিবন্ধন দিয়ে তিনি কোন পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন, বিশেষ করে নামের আগে ‘ডাক্তার’ বা ‘এমবিবিএস’ পরিচয় ব্যবহারের বৈধতা রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয়। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনে স্বীকৃত MBBS/BDS ছাড়া নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
‘দুই যুগের বেশি সময় ধরে চিকিৎসা’—ফিরোজ কবিরের বক্তব্যে উঠে এলো কার্যক্রম শুরুর ভিন্ন ব্যাখ্যা! স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে ফিরোজ কবিরের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, শুরুতে তিনি ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে স্থানীয় রোগীদের চাপ বাড়তে থাকায় তাঁর দুই ভাগনে ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের পরামর্শে রোগীদের প্রেসক্রিপশন তৈরি করে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন বলে দাবি করেন তিনি।
ফিরোজ কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেসক্রিপশনে ‘ডা.’ বা ‘ডক্টর’ ধরনের পরিচয় ব্যবহারের আইনগত বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি অবৈধ হলে তিনি এমন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন না। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পাশাপাশি প্রেসক্রিপশনে ব্যবহৃত যোগ্যতা, নিবন্ধন নম্বর, চিকিৎসা দেওয়ার পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন—সবকিছুই স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে রোগী দেখানোর অভিযোগ সত্য হলে, এতদিন ধরে কীভাবে এবং কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে—সেটিও তদন্তের আওতায় আসা জরুরি। অনুসন্ধানের সময় সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ—‘ভিডিও করলে মামলা দেব’ বলার দাবি অনুসন্ধানের সময় চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের ভিডিওচিত্র ধারণ করা নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে প্রতিবেদকের দাবি। সরেজমিনে ভিডিও ধারণ চলাকালে ফিরোজ কবিরের কাছ থেকে একটি ফোন প্রতিবেদকের হাতে দেওয়া হয় এবং ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভিডিও ধারণ ও সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনে তাঁকে ৫ লাখ টাকার চাঁদাবাজির মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেন। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর প্রভাব রয়েছে বলেও দাবি করে দ্রুত ভিডিও ধারণ বন্ধ করে স্থান ত্যাগ করতে বলা হয় বলে অভিযোগ। তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পূর্ণ বক্তব্য, ফোনকলের রেকর্ড/প্রাসঙ্গিক প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই ছাড়া সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
শিশু রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ—যোগ্যতা ও অনুমোদন যাচাইয়ের দাবি! অনুসন্ধানের সময় ধারণ করা ভিডিওচিত্রে শিশু ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিতে আসার দৃশ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের প্রশ্ন—শিশু রোগীদের চিকিৎসা কে দিচ্ছেন, তাঁর স্বীকৃত চিকিৎসা-যোগ্যতা কী, তাঁর পেশাগত নিবন্ধন কোন কর্তৃপক্ষের অধীনে এবং রোগী দেখার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না?
প্রতিবেদনের হাতে থাকা প্রেসক্রিপশনে ডা. মোঃ ফিরোজ কবির D.M.F (General Practitioner) Reg. No-2021004 এবং Jahanara Pharmacy, Ramchandrapur Hat, Chapai Nawabganj-এর তথ্য উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা ও বৈধতা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল চিকিৎসকদের নিবন্ধন ও চিকিৎসা পেশার মানসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শিক্ষাগত সনদ, পেশাগত নিবন্ধন, চিকিৎসা দেওয়ার আইনগত পরিধি এবং প্রেসক্রিপশন ব্যবহারের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
চিকিৎসার নামে প্রেসক্রিপশন, রোগীর হাতে উচ্চমূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক—চিকিৎসা না ওষুধ বাণিজ্য? অভিযোগ উঠেছে, চিকিৎসকের পরিচয় ব্যবহার করে নিজস্বভাবে তৈরি প্রেসক্রিপশনে রোগী ও শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের উচ্চমূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধ লিখে দিচ্ছেন ফিরোজ কবির। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধের বিল বাবদ রোগীপ্রতি প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—রোগীর প্রকৃত প্রয়োজন, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা-প্রটোকল অনুসরণ করে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, নাকি চিকিৎসাসেবার আড়ালে ওষুধ বিক্রির একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে? বিশেষ করে শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন, ওষুধের ধরন, মূল্য, রোগীর প্রয়োজনীয়তা এবং চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা দ্রুত যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের দাবি—সনদ, নিবন্ধন ও ফার্মেসির অনুমোদন খতিয়ে দেখার প্রয়োজন -?রামচন্দ্রপুর হাটে অনুমোদন ও পেশাগত পরিচয়সংক্রান্ত প্রশ্নের মধ্যে রোগী দেখার অভিযোগটি সামনে আসায় বিষয়টি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শিক্ষাগত সনদ, পেশাগত নিবন্ধন, প্রেসক্রিপশন লেখার আইনগত এখতিয়ার, ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারের বৈধতা এবং জাহানারা ফার্মেসির ওষুধ বিক্রির অনুমোদন—প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনে নিবন্ধিত চিকিৎসকদের রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং চিকিৎসকদের পেশাগত মান নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। একই আইনে প্রতারণামূলকভাবে নিজেকে নিবন্ধিত চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিভিত্তিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কার্যক্রমটি আইনসম্মত ছিল কি না এবং কোনো বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না।
সিভিল সার্জন ও প্রশাসনের বক্তব্য—নিবন্ধন ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পর ব্যবস্থা-! এ বিষয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন ও প্রযোজ্য অনুমোদন যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় ব্যবহার করলে তাঁর পেশাগত নিবন্ধনের বৈধতা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে কোন ধরনের প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতার ভিত্তিতে তিনি রোগী দেখছেন এবং প্রেসক্রিপশন দেওয়ার আইনগত এখতিয়ার রয়েছে কি না—সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, DGHS-এর নথিতে MATS-এর সঙ্গে DMF-ভিত্তিক মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রশিক্ষণ কোর্সের উল্লেখ রয়েছে; তাই ‘D.M.F’ পরিচয়ের প্রকৃত অর্থ, নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমোদিত পেশাগত পরিধি কর্তৃপক্ষের নথি দিয়ে যাচাই করাই হবে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
শুধু রামচন্দ্রপুর নয়—অনুমোদনহীন চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধে তদন্তের দাবি-! রামচন্দ্রপুর হাটে চিকিৎসাসেবা ও প্রেসক্রিপশন ব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
তাঁদের বক্তব্য, চিকিৎসাসেবা মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় চিকিৎসকের পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন এবং রোগী দেখার অনুমোদন সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন—ফিরোজ কবিরের প্রকৃত শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা কী, তাঁর উল্লেখিত Reg. No-2021004 কোন কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন নম্বর, ‘ডাক্তার’ বা ‘এমবিবিএস’ পরিচয় ব্যবহারের বৈধতা রয়েছে কি না এবং জাহানারা ফার্মেসির কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে কি না। অভিযোগের কোনো অংশ সত্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে অননুমোদিত বা বিভ্রান্তিকর পরিচয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ না থাকে, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান জোরদারের দাবি উঠেছে।