
হোসেন বাবলা:২২ অক্টোবর, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের পটিয়ার একটি ছোট্ট জরাজীর্ণ ঘর। টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, মাটির দেয়ালের বিভিন্ন অংশও ভেঙে গেছে। অথচ সেই ঘরেরই এক কোণে যত্ন করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে অসংখ্য ক্রেস্ট, জার্সি আর পুরস্কার।
এগুলো কোনো দামি শখের জিনিস নয়, বরং একটি মেয়ের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাক্ষী। মেয়েটির নাম অন্তু দে। বয়স মাত্র ১৮ বছর। একসময় বাড়ির উঠানে শখের বশে ফুটবল খেলতেন, আর এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটবল প্রতিযোগিতায় ডাক পড়ে তাঁর।
পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা গ্রামের মেয়ে অন্তু। বাবা রতন দে ও মা লক্ষ্মী দের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তাঁর বাবা একসময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। গত চার বছর ধরে গ্রামের একটি ছোট পানের দোকান চালান। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ছালেহ নূর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন অন্তু।
ফুটবলের প্রতি অন্তুর ভালোবাসার শুরু দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়। প্রতিবেশী ছেলেদের সঙ্গে বাড়ির উঠানে খেলতেন, কখনো ছুটে যেতেন গ্রামের মাঠে। এক চাচাতো ভাই তাঁকে মাঠে নিয়ে যেতেন খেলতে। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, এই মেয়েটিই একদিন দেশের বিভিন্ন জেলার ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন।
চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুল ভিত্তিক খেলায় অংশ নিতে শুরু করেন অন্তু। তাঁর প্রতিভা দেখে উৎসাহ দিতেন তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সাগর দে। বিদ্যালয়ের দলের অধিনায়কের দায়িত্বও পান তিনি। ৫ম শ্রেণিতে পড়ার সময় পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় দুবার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন অন্তু। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সুযোগ পান অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলার। ২০১৮ সালের দিকে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সমর কান্তি দে ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিনের মাধ্যমে পরিচয় হয় স্থানীয় নারী ফুটবলের সংগঠক সৈয়দ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। এরপর যুক্ত হন পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমিতে।
একাডেমির প্রায় ৪০ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন অন্তু। মাত্র দুই দিন অনুশীলনের পর ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর স্টেডিয়ামে লোহাগাড়া উপজেলার দলের বিপক্ষে মাঠে নামেন। ওই ম্যাচে পটিয়া জিতলেও পরবর্তী সময়ে আনোয়ারা উপজেলার দলের কাছে হেরে যায় তাঁর দল।
একই বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পটিয়া উপজেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। পরের বছর জেলা পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায় দলটি। পটিয়ার হয়ে খেলে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন অন্তু। জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে ৪০ জনের মধ্য থেকে নির্বাচিত ১৮ খেলোয়াড়ের একজন ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নেন ১১ জনের চূড়ান্ত দলে। প্রথম ম্যাচে ফেনীর কাছে চট্টগ্রাম ২-০ গোলে হেরে যায়।
২০২০ সালে ঢাকায় বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় খেলেন অন্তু। একই বছর আনোয়ারার একটি দলের হয়ে সিলেটে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এরপর রংপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বগুড়া, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা ও জয়পুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন তিনি।
২০২১ সালে যুব গেমসে চট্টগ্রাম জেলা দল চ্যাম্পিয়ন হয়, সেই দলের খেলোয়াড় ছিলেন অন্তু। পরে ফেনীতে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পর্যায়ের খেলায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দল রানারআপ হয়।
২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ উইমেনস লিগে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পান তিনি। ১০টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই প্রতিযোগিতায় ক্লাবটি রানারআপ হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ ফুটসাল লিগে চাঁদপুর ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলেছেন অন্তু। বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে মৌলভীবাজার জেলার বিপক্ষেও মাঠে নেমেছেন তিনি।
এ পর্যন্ত সেরা খেলোয়াড় হিসেবে চারটি এবং ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হিসেবে পাঁচটি পুরস্কার পেয়েছেন অন্তু। ফুটবল খেলে পাওয়া আর্থিক সহায়তা দিয়ে পরিবারের খরচেও কিছুটা সহযোগিতা করেছেন। তাঁর কাছে পুরস্কারগুলো শুধু অর্জনের স্মারক নয়, বরং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।
অন্তুর ফুটবলযাত্রায় পরিবারের সমর্থন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক অনটন থাকলেও মেয়ের আগ্রহ দেখে কখনো খেলতে বাধা দেননি মা-বাবা। বরং তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন। মা লক্ষ্মী দের আশা, একদিন মেয়ে জাতীয় নারী ফুটবল দলে জায়গা করে নেবেন।
অন্তু বলেন, ‘শৈশব থেকেই খেলায় উৎসাহ দিয়েছেন আমার মা-বাবা। তাঁদের সহায়তা না পেলে এত দূর আসা কঠিন হতো। প্রাথমিকে পড়ার সময় গ্রামের মাঠে খেলতাম, তখন আমিই ছিলাম একমাত্র মেয়ে। আমার চাচাতো ভাই প্রকাশ দে আমাকে খেলাধুলায় বেশ উৎসাহ দিয়েছেন।’
তাঁর পথচলায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। তিনি চট্টগ্রামের বাংলাদেশ বয়েজ ফুটবল একাডেমিরও কর্ণধার। অন্তুর পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে সহায়তা করেছেন। অনুশীলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও পাশে থেকেছেন তিনি।
২০১৭ সালে এলাকার নারী খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ শুরু করেন সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। তাঁদের অনুশীলন ও বিকাশের সুযোগ করে দিতে গড়ে তোলেন পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমি। তাঁর মতে, প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক প্রতিভাবান মেয়ে খেলাধুলায় আগ্রহী হলেও যথাযথ উৎসাহ ও সুযোগের অভাবে সামনে এগোতে পারেন না। অন্তু দের মতো খেলোয়াড়েরা এই একাডেমির মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
একাডেমির নারী কোচ নাছরিন আক্তার জানান, অন্তু নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে একজন ভালো খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
ফুটবল খেলতে গিয়ে একসময় নানা কটূক্তির শিকার হতে হয়েছে অন্তুকে। মেয়ে হয়ে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলা কিংবা ছেলেদের মতো পোশাক পরে বাইরে যাওয়া নিয়ে অনেকেই তাঁকে কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু সেসব বাধা তাঁর আগ্রহ কমাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে এলাকার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে, এখন অনেকেই তাঁকে উৎসাহ দেন।
বর্তমানে নিজের খেলার পাশাপাশি চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দেন অন্তু। যে মেয়েটি একসময় গ্রামের মাঠে একমাত্র নারী খেলোয়াড় হিসেবে খেলতেন, এখন তিনিই অন্য শিক্ষার্থীদের ফুটবলার হয়ে ওঠার পথ দেখাচ্ছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী। সে আমাদের গর্ব। নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।’
অন্তুর স্বপ্ন একদিন বাংলাদেশের জাতীয় নারী ফুটবল দলে জায়গা করে নেওয়া। জাতীয় পর্যায়ের নারী ফুটবলার শামসুন্নাহারসহ বেশ কয়েকজনকে অনুসরণ করেন তিনি। তাঁদের মতো দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেন এই তরুণী।
তবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পটিয়ায় মেয়েদের ফুটবল অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠ নেই। বর্তমানে পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও অনুশীলন করেন। মেয়েদের জন্য আলাদা মাঠের ব্যবস্থা করা গেলে অনুশীলনের পরিবেশ আরও ভালো হতো বলে মনে করেন অন্তু।
তাঁর বাড়ির ভাঙা দেয়াল, টিনের চাল আর অভাবের সংসার হয়তো প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেয় জীবনের কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু সেই ঘরের এক কোণে যত্ন করে রাখা ক্রেস্ট ও জার্সিগুলো অন্য এক গল্প বলে—পরিশ্রম, সাহস আর স্বপ্নের গল্প।
পটিয়ার চক্রশালা গ্রামের উঠান থেকে শুরু হওয়া অন্তুর ফুটবলযাত্রা আজ দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাঠে পৌঁছেছে। এবার তাঁর লক্ষ্য আরও বড়—জাতীয় নারী ফুটবল দলের জার্সি গায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন, যথাযথ সুযোগ এবং তাঁর মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশে থাকার সম্মিলিত উদ্যোগ।
অন্তু দের গল্প তাই শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।
সূত্রঃ অনলাইন গণমাধ্যম,,,