
বিশেষ অনুসন্ধান | ক্রাইম সিন ইউনিট মিডিয়া সেল ক্রাইম এলার্ট এসএম রুবেল! চাঁপাইনবাবগঞ্জ | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চর অনুপনগর ইউনিয়নে পূর্ব শত্রুতা ও সীমানা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের বসতবাড়িতে ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী মোঃ আশিকুল হাবীব (৩৯) বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৪০-৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। এজাহার সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবত আসামিদের সাথে চলাচলের রাস্তা ও সীমানা নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল, যা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
তবে অভিযোগে বলা হয় ঘটনার দিন আশিকুল হাবীব তার ছেলেকে নিয়ে নটরডেম কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এই সুযোগে পূর্বপরিকল্পিতভাবে গত ১১ সেপ্টেম্বর দুপুর অনুমান ১:৪৫ ঘটিকার সময় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আসামিরা তার বাড়িতে হামলা চালায়। প্রধান আসামিদের নির্দেশে দুষ্কৃতকারীরা গেট ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে দুইটি এসি, থাই গ্লাস, কাঠের জানালা, মোটর, বিদ্যুৎ মিটার ও ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি সাধিত হয় এবং সীমানায় থাকা ৩০টি কাঁঠাল গাছ কেটে আরও ৩ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়।
ভাঙচুরের পাশাপাশি বাড়িতে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর ঘর থেকে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার (মূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা), নগদ ৫ লাখ টাকা, দুটি ল্যাপটপ, ট্যাব ও আইফোন (মূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা) এবং আড়াই লাখ টাকা মূল্যের ৫টি তোতাপুড়ি ছাগল চুরি করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। বাধা দিতে গেলে ভুক্তভোগীর স্ত্রী ও ১৩ বছরের নাবালিকা মেয়েকে এলোপাতাড়ি মারধর ও রক্তাক্ত করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। আত্মীয়-স্বজনের সাথে আলোচনা ও ঢাকা থেকে ফিরে এসে এজাহার দায়ের করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে এজাহারে জানানো হয়।
অনুসন্ধানে জানতে সদর পুলিশ জানান মামলাটির এজাহারে উল্লিখিত প্রধান ১৪ জন এজাহারনামীয় আসামি হলেন—১. মোঃ ওবাইদুল হক (৬১), পিতা-মৃত আব্দুর রহমান; ২. মোঃ সাইফুল (৬৩), পিতা-মৃত আব্দুর রহমান; ৩. মোঃ এস্তার আলী (৬৮), পিতা-মৃত ভণ্ড হাজী; ৪. মোঃ শাহলাল (৬৫), পিতা-মৃত মানুর উদ্দিন; ৫. মোঃ রেজাউল করিম (৫০), পিতা-মোঃ গোলাম মোস্তফা; ৬. মোঃ তরিকুল ইসলাম (৪৪), পিতা-মৃত আজাহার আলী; ৭. মোঃ হুমায়ন (৫২), পিতা-মৃত আমিনুল ইসলাম; ৮. মোঃ মাইনুল ইসলাম (৩৫), পিতা-মোঃ তরিকুল ইসলাম; ৯. মোঃ ডালিম (২৫), পিতা-মৃত আলফাজ উদ্দিন; ১০. মোঃ পারভেজ আলী (২৫), পিতা-মোঃ মনিরুল ইসলাম; ১১. মোঃ সিফাত আলী (২০), পিতা-আব্দুল্লাহ; ১২. মোঃ ইউসুফ আলী (৩০), পিতা-মৃত আনারুল ইসলাম; ১৩. মোঃ আমিনুল ইসলাম (২৭), পিতা কোরবান আলী; এবং ১৪. মোঃ তেবুল (৩৮), পিতা-অজ্ঞাত। এরা সকলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার অন্তর্গত চরঅনুপনগর গ্রামের বাসিন্দা। এছাড়া উক্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আরও ৪০ থেকে ৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সশরীরে অংশ নিয়ে অভিযুক্তদের সহায়তা করেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সার্বিক বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) একরামুল হোসাইন জানান, “এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ১৪ জন নামীয় আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে সদর মডেল থানা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান শুরু করেছে। মামলার তদন্তভার একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, যেন দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এছাড়া ওই এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞ রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা এবং বিচারধীন বিষয় নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর এমন সহিংস আক্রমণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জমি জমা বা সীমানা সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে আদালতের আশ্রয় নেওয়াই সভ্য সমাজের রীতি। তা ব্যাহত করে নিরীহ পরিবার ও নারীদের ওপর এমন হামলা সামাজিক নিরাপত্তার চরম অবক্ষয় নির্দেশ করে। রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে পুলিশ প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবার সুষ্ঠু বিচার ও আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানাতে গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মরত পরিদর্শক মামলার বাদি মো. আশিকুল হাবিব জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি বড় ছেলে মো. সাইমুম হাবিবকে নিয়ে নটরডেম কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় যান। পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে আমার স্ত্রী ও ১৪ বছরের কিশোরী কন্যা বাড়িতে একা থাকা অবস্থায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল সন্ত্রাসী গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। হামলাকারীরা প্রায় অর্ধকোটি টাকার সম্পদ ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এছাড়া গচ্ছিত গৃহপালিত পশু (গরু, বাছুর, ছাগল, ভেড়া, কবুতর) এবং বাগানের ঔষধি গাছপালা কেটে নিয়ে তাদের সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে। তিনি অবিলম্বে এই সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মা ও মেয়ের ওপর চালানো নির্যাতন সম্পর্কে বাদী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, হামলাকারীরা বাধা দেওয়ার সময় তার কিশোরী মেয়েকে এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং তাদের শরীরে বিভিন্ন স্থানে জখম করে। এছাড়া বসতবাড়ির সীমানার প্রায় ৩০টি কাঁঠালগাছ কেটে ফেলা হয়, যার আনুমানিক মূল্য ৩ লাখ টাকা এবং আড়াই লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি তোতাপুরি ছাগল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভিযুক্তরা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে পরদিন আবারও হামলা চালানোর হুমকি দেয় এবং আনাকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যার ঘোষণা দেয়, যা জননিরাপত্তার জন্য চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দারিয়েছেন।
এলাকার পুরোনো এই রাস্তার বিরোধ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগীপক্ষ জানায়, ১৯৯০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসন রাস্তাটিকে সরকারি বা ডিসি রাস্তা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিয়েছিল। বর্তমানে বিষয়টি সদর কোর্ট এবং উচ্চ আদালতের বিচারাধীন রয়েছে। আদালতের রায় আসার পরও কেন পরিস্থিতি এভাবে সহিংস রূপ নিল এবং কীভাবে এত মানুষ একত্র হলো, তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি।
এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এজাহারে উল্লেখিত হামলা, ভাঙচুর, চুরি ও প্রাণনাশের হুমকির সত্যতা যাচাইয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সিসিটিভি বা মোবাইল ফুটেজ এবং আদালতের নথিপত্র পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ঘটনায় কেবল ভাঙচুর বা লুটপাটের ফৌজদারি অপরাধই ঘটেনি, বরং এটি সুপরিকল্পিত চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ। সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, এখানে তার প্রকাশ্য লঙ্ঘন ঘটেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুর ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং মব জাস্টিসের মতো ঘটনায় প্রচলিত ফৌজদারি আইনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপের কাছে নমনীয় না হয়ে মূল উসকানিদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আদালতের রায় অমান্য করার দুঃসাহস না দেখায়।