
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। একটি মানবিক, জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত সমাজ গঠনের জন্য শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে তোলা। আর এই সামগ্রিক শিক্ষণ প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মূল্যায়ন বা পরীক্ষা।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে—পরীক্ষার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানো, ছোট করা বা অযোগ্য প্রমাণ করা নয়। প্রকৃত অর্থে পরীক্ষা হলো শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নের একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক প্রক্রিয়া। তাই যথার্থভাবেই বলা যায়—
“পরীক্ষা মানে শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন, ভুল ও অযোগ্যতার বিচার নয়।”
আধুনিক শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী মূল্যায়ন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়; বরং এটি শিক্ষণ কার্যক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন শিক্ষার্থী কতটুকু শিখেছে, কোন ক্ষেত্রে তার দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কোথায় আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে—এসব বিষয় নির্ণয় করাই মূল্যায়নের মূল লক্ষ্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষাকে ভুল ধরার বা ব্যর্থতা প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মনে জন্ম নেয় ভয়, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসহীনতা। অথচ প্রকৃত শিক্ষা কখনোই শিক্ষার্থীকে হেয় করে না; বরং তাকে আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
একজন শিক্ষার্থী যদি দশটি প্রশ্নের মধ্যে ছয়টির সঠিক উত্তর দিতে পারে, তবে সেটিই তার অর্জন, তার শেখার অগ্রগতি। বাকি চারটি ভুলকে ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখলে শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বরং সেই ভুলগুলোই ভবিষ্যৎ শেখার নতুন সুযোগ ও উন্নতির দিকনির্দেশনা হতে পারে। কারণ ভুল থেকেই মানুষ শেখে, অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং নিজেকে আরও পরিণত করে তোলে।
বর্তমান বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সেখানে পরীক্ষাকে প্রতিযোগিতা বা আতঙ্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং শেখার ধারাবাহিক উন্নয়নের একটি সহায়ক উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই আধুনিক ও মানবিক মূল্যায়ন ধারণার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও সক্ষমতাকে চিহ্নিত করা, তাকে উৎসাহিত করা এবং শেখার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা। যদি আমরা পরীক্ষাকে ভয়ের প্রতীক না বানিয়ে শেখার একটি স্বাভাবিক ও ইতিবাচক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জ্ঞান অর্জনে আরও আগ্রহী হবে।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর। আমরা যদি মূল্যায়নকে ভুল ও অযোগ্যতার বিচার হিসেবে না দেখে শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নের একটি মানবিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করি, তবে শিক্ষার্থীরা ভয় নয়, আনন্দ ও আগ্রহ নিয়ে শিখবে। আর তখনই গড়ে উঠবে একটি আলোকিত, দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ—যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী হবে সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
(লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক)