
বিশেষ প্রতিবেদক: এম. নজরুল ইসলাম খান
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩৮০টি উপজেলায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য এবং ২৮৯টি উপজেলায় সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য, অথবা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার ইঙ্গিতই দেয় না; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার নেতৃত্ব সংকটকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদের চিত্র। প্রাথমিক স্তরে আনুমানিক ৩২ থেকে ৩৪ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, যা মোট বিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ। অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক নেই। বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা কিছুটা ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে দেশে প্রায় ৩৭ থেকে ৪০ হাজারের মতো প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে—যা একটি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনার জন্য দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক সংকট, প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘদিনের শূন্যতা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে শিক্ষার গুণগত মান ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই; কোথাও আবার বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় একাডেমিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকার ফলে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি আদায়, কোচিং বাণিজ্য এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। প্রশাসনিক দুর্বলতা এসব অনিয়মকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর সামাজিক ও নৈতিক ইস্যু। শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার, যা রাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত। কিন্তু যখন শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় বা তাদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করা হয়, তখন তা তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার শামিল।
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) ৪% থেকে ৬% শিক্ষা খাতে ব্যয় করা কাম্য। অথচ বাংলাদেশে এই হার প্রায়শই ২% এর আশেপাশে সীমাবদ্ধ থাকে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও কম। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দৃশ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প—যেমন সেতু বা সড়ক নির্মাণ—প্রায়ই অগ্রাধিকার পায়, কারণ এগুলোর ফলাফল দৃশ্যমান এবং সহজে প্রচারযোগ্য। কিন্তু শিক্ষা খাত, যা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল ভিত্তি, তা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
এই পরিস্থিতির উত্তরণে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি “মেগা শিক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনা”। এর আওতায় দ্রুত শূন্যপদ পূরণ, বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকসহ প্রশাসনিক ও শিক্ষকের পদে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের উন্নয়ন, শিক্ষা প্রশাসনের আধুনিকীকরণ এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করে তা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত বর্তমানে একটি স্পষ্ট সংকটকাল অতিক্রম করছে—এটি আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কেবল অবকাঠামো নয়, মানুষের মেধা ও মানসিকতার উন্নয়নই একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সেই বিবেচনায় শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষা শুধু একটি খাত নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি এবং একটি সভ্য সমাজের প্রতিচ্ছবি। তাই এখনই সময়—শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের শীর্ষে নিয়ে আসার। অন্যথায়, এই অবহেলার মূল্য আগামী প্রজন্মকে বহন করতে হবে, এবং এর দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না।