
এম নজরুল ইসলাম খান
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল আমাদের সামনে শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে দেখার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে। পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি।
পাসের হার কমেছে—এটাই কি এবারের ফলাফলের সবচেয়ে বড় খবর? শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নয়। বড় প্রশ্ন হলো, এই ফলাফল শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার সক্ষমতার কতটা প্রতিফলন ঘটিয়েছে?
পাসের হার বেশি হলেই শিক্ষার মান ভালো—এ ধারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি পাসের হার কমলেই শিক্ষার মান বেড়েছে—এটিও সত্য নয়। তাই কোন বোর্ডে কত শতাংশ পাস করল কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাস করল—এই প্রতিযোগিতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার সাফল্য মাপতে হবে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, যুক্তিবোধ ও বাস্তব প্রয়োগক্ষমতা দিয়ে।
শিক্ষার প্রশ্ন শুরু করতে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকে
এসএসসি ফলাফল বিশ্লেষণের আগে আমাদের দেখতে হবে শিক্ষার্থীরা নিচের শ্রেণিগুলোতে কী শিখেছে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠা একজন শিক্ষার্থী কি বাংলা সাবলীলভাবে পড়তে পারে? অষ্টম-নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী কি ইংরেজি লেখা বুঝে পড়তে পারে? সপ্তম-অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী কি মৌলিক গণিত করতে পারে?
যদি এসব মৌলিক দক্ষতা দুর্বল থাকে, তাহলে এসএসসি পরীক্ষার আগে কয়েক মাসের কোচিং বা অতিরিক্ত প্রস্তুতি দিয়ে দীর্ঘদিনের শেখার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন।
গণিত একটি ধারাবাহিক জ্ঞান। প্রাথমিক পর্যায়ে সংখ্যা, হিসাব, ভগ্নাংশ, পরিমাপ ও সমস্যা সমাধানের ভিত্তি দুর্বল হলে মাধ্যমিক পর্যায়ে তার প্রভাব পড়বেই। একইভাবে ইংরেজি শুধু একটি পরীক্ষার বিষয় নয়, একটি ভাষা। Grammar-এর নিয়ম মুখস্থ করলেই ইংরেজি শেখা হয় না; Reading, Writing, Listening ও Speaking—চারটি দক্ষতার সমন্বিত বিকাশ প্রয়োজন।
প্রশ্নটি শুধু শিক্ষার্থীর নয়, শিক্ষকেরও
শিক্ষার্থীর ফল খারাপ হলে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করা শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যথেষ্ট নয়। আমাদের তাকাতে হবে শিক্ষকতার মানের দিকেও।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক আছেন কি? কতজন শিক্ষক আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত? কতজন শিক্ষক মানসম্মত প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন? কতজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি শনাক্ত করে তা পূরণের ব্যবস্থা করতে পারেন?
শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ও সনদ যাচাইও হতে হবে কঠোর ও স্বচ্ছ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাল সনদ ও নিয়োগ-অনিয়মের তথ্য সামনে আসা তাই শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি সরাসরি শিক্ষার মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যোগ্য শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়।
মূল্যায়ন হবে শেখার আয়না
এবারের ফল নিয়ে খাতা কঠোরভাবে দেখা হয়েছে কি না, প্রশ্ন কঠিন হয়েছে কি না—এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু মূল বিষয় হওয়া উচিত খাতা কতটা কঠোরভাবে দেখা হয়েছে তা নয়; বরং মূল্যায়ন কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল।
অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে পাসের হার বাড়ানো যেমন শিক্ষার মান নিশ্চিত করে না, তেমনি অকারণে কঠোর মূল্যায়ন করে পাসের হার কমানোও মানোন্নয়নের প্রমাণ নয়।
প্রয়োজন মানসম্মত প্রশ্নপত্র, প্রশিক্ষিত পরীক্ষক, অভিন্ন মূল্যায়ন মানদণ্ড এবং এমন পরীক্ষা, যা মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর বোঝাপড়া ও প্রয়োগক্ষমতা যাচাই করবে।
কোচিংনির্ভরতা নয়, শক্তিশালী বিদ্যালয় চাই
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শিক্ষা না পেলে কোচিংনির্ভরতা বাড়ে। তখন শিক্ষা ধীরে ধীরে শেখার পরিবর্তে পরীক্ষায় পাসের প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
তাই কোচিং নিয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞার আলোচনা যথেষ্ট নয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকেই কার্যকর করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শিক্ষা তার বিদ্যালয়েই পায়।
একই সঙ্গে এসএসসি ফলাফলের প্রভাব উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও বিবেচনায় নিতে হবে। বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার সম্ভাবনা থাকলে শিক্ষক, অবকাঠামো ও শিক্ষা ব্যয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও নতুন করে করতে হবে।
এখন প্রয়োজন পাসের সংস্কৃতি থেকে শেখার সংস্কৃতিতে যাত্রা
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি দক্ষতাভিত্তিক, ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থা।
প্রাথমিক পর্যায়ে পড়া, লেখা ও গণিতের ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি শনাক্ত করতে হবে। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশ্ন প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে মান নিশ্চিত করতে হবে। কারিকুলাম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নকে আলাদা আলাদা কর্মসূচি না দেখে একটি সমন্বিত শিক্ষা সংস্কারের অংশ করতে হবে।
কারণ শিক্ষা কোনো একদিনের পরীক্ষা নয়; এটি মানুষের সক্ষমতা নির্মাণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল তাই আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখেছে—
আমরা কি শুধু বেশি শিক্ষার্থীকে পাস করাতে চাই, নাকি এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই যারা সত্যিকার অর্থে পড়তে পারে, বুঝতে পারে, গণনা করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে এবং জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে?
পাসের হার একটি সংখ্যা। কিন্তু শিক্ষার্থীর অর্জিত দক্ষতা একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
সুতরাং এবারের ফলাফলকে পাস-ফেলের বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে এখনই আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে শিক্ষার্থীর দক্ষতা, শিক্ষকতার মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যতের দিকে।
(লেখক :সাংবাদিক ও শিক্ষক)