
এম নজরুল ইসলাম খান
বাংলাদেশে বর্তমানে সংক্রামক রোগের পরিস্থিতি কিছুটা উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে, বিশেষ করে হাম রোগের পুনরুত্থান জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালে ইতোমধ্যে ২৫৫ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালে মোট রোগীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এ থেকে স্পষ্ট যে, হামের সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আক্রান্তদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ায় অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি তুলে ধরে। যদিও জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও শঙ্কাজনক করে তুলছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর লক্ষণ হিসেবে উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া, শরীরে লাল ফুসকুড়ি এবং দুর্বলতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং অন্ধত্বের মতো জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে—বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় এক লাখের বেশি শিশু হাম রোগে মারা গেছে, যা এই রোগের ভয়াবহতা নির্দেশ করে। বাংলাদেশেও এর পুনরুত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে—যেমন টিকাদানের ঘাটতি, কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহা, অপুষ্টি, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং সচেতনতার অভাব।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সচেতন করা সম্ভব।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করণীয়:
১. সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা:
প্রতিদিনের সমাবেশ, ক্লাসরুম আলোচনা এবং বিশেষ সেমিনারের মাধ্যমে হাম রোগের লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করতে হবে।
২. টিকাদান সম্পর্কে উৎসাহ প্রদান:
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের টিকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং টিকাদানের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।
৩. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা:
বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং অসুস্থ শিক্ষার্থীদের সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ে না আসার পরামর্শ দেওয়া।
৪. স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ:
শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে অভিভাবকদের অবহিত করা।
৫. পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি:
শিশুদের সুষম খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
৬. গ্রাম ও কমিউনিটি পর্যায়ে সংযোগ বৃদ্ধি:
বিদ্যালয়ের উদ্যোগে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও কমিউনিটি নেতাদের সাথে সমন্বয় করে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা।
হাম রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। অতীতে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এই রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আবারও সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
অতএব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রতিটি বিদ্যালয় যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একটি সুস্থ সমাজ গঠন করা সহজ হবে।
লেখক, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক নেতা,
এম নজরুল ইসলাম খান
প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক চট্টগ্রাম মডেল স্কুল