
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বোমা বানাতে গিয়ে ‘ভয়াবহ বিস্ফোরণ’ ছিন্নভিন্ন ২ দেহ, আশঙ্কাজনক ৪
চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিশেষ প্রতিনিধি:
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই দুইজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন চার জন।শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৫টার দিকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে।চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিহত দুইজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তবে আহতরা হলেন- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামের মো.বজলুর রহমান (২০) ও মো. মিনহাজ (২২) এবং একই উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের উপরধুমি এলাকার মো. শুভ (২০), আরেকজনের নাম পাওয়া যায়নি। পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে ফাঁটাপাড়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. কালামের বসতবাড়িতে একদল দুষ্কৃতকারী বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ অবস্থান করছিল। সেখানে তারা ককটেল তৈরি করার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ঘটনাস্থলেই অজ্ঞাতপরিচয় দুইজন প্রাণ হারান।।নিহতদের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও বিস্ফোরণে গুরুতর জখম হওয়া চার জনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
পরে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তিনি আরও বলেন, চরবাগডাঙ্গায় অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিবি, র্র্যাব মোতায়েন করা আছে, এবং এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।মরদেহ সনাক্তের চেষ্টা চলছে, আইনি অবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি। ককটেল তৈরির সময় এক ভয়াব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে’ এতে ঘটনাস্থলেই অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে প্রাণহানি ঘটেছে এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। শনিবার ভোরে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ডতায় পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং দুষ্কৃতকারীদের আস্তানার একাংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভোররাতে বিকট শব্দে থরথর কম্পন’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে ফাঁটাপাড়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. কালামের বসতবাড়িতে হঠাৎ এক বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, “শব্দটি এতই শক্তিশালী ছিল যে আশেপাশের ঘরবাড়িতেও কম্পন অনুভূত হয়। আমরা এসে দেখি কালামের বাড়ির একটি অংশ পুরোপুরি বিধ্বস্ত এবং সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় কয়েকটি দেহ পড়ে আছে।”
বিস্ফোরণের পর স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার কাজে অংশ নেন। ঘটনাস্থলে মুখমণ্ডল বিকৃত অবস্থায় দুইজনকে মৃত দেখতে পাওয়া যায়। গুরুতর জখম অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে প্রথমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আহতরা হলেন’ মো. বজলুর রহমান (২০), চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন। মো. মিনহাজ (২২), চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন। মো. শুভ (২০), রাণিহাটি ইউনিয়ন। চতুর্থ আহত ব্যক্তির নাম ও পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও প্রাথমিক তদন্ত চলমান রয়েছেন!
ঘটনার পরপরই বিজিবি, র্যাব এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস। পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, একদল দুষ্কৃতকারী ওই বাড়িতে ককটেল তৈরির সরঞ্জামসহ অবস্থান করছিল। ককটেলগুলো প্রস্তুত করার সময় অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণ ঘটলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান’ বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছি এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। ঘটনার পর এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অনুসন্ধানে কী বেরিয়ে আসছে?
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুষ্কৃতকারীরা কেন এবং কী উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ ককটেল তৈরি করছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাড়িটি নির্জন হওয়ায় অপরাধীরা একে আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মালিক মো. কালামের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখছে এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না। বর্তমানে ঘটনাস্থলটি ঘিরে রাখা হয়েছে এবং আলামত সংগ্রহের কাজ চলছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নাশকতার ছক না কি অন্য কিছু? তদন্তে মিলছে চাঞ্চল্যকর তথ্য’দুপুর ও বিকেলের তদন্ত চিত্র’ ভোররাতের সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের রেশ কাটতে না কাটতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরক ও আলামত জব্দ, সকালে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট এবং বোম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রচুর পরিমাণে কাঁচের টুকরো, সুতলি, জর্দার কৌটা এবং গান পাউডার সদৃশ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী মানের ককটেল বা হাতবোমা তৈরি করা হচ্ছিল, যা সাধারণ ককটেলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী।
বাড়ির মালিকের খোঁজ ও ছায়া তদন্ত
যে বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেই বাড়ির মালিক মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. কালামের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই কালাম পলাতক থাকায় পুলিশের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ডিবি পুলিশ ও র্যাব তার সম্ভাব্য অবস্থানগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, কালামের আশ্রয় ও সরাসরি মদতেই এই ‘বোমা তৈরির কারখানা’ গড়ে উঠেছিল। আহতদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে জিজ্ঞাসাবাদ’ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চারজনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। তবে তাদের মধ্যে একজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসা বাদের ‘আওতায় আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ জানার চেষ্টা করছে। তারা কার নির্দেশে সেখানে জমা হয়েছিল? বিপুল পরিমাণ ককটেল তৈরির লক্ষ্যবস্তু কী ছিল? এই চক্রের নেপথ্যে কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন আছে কি না? মরদেহ শনাক্তকরণে ডিএনএ পরীক্ষার প্রস্তুতি বিস্ফোরণে নিহত দুই ব্যক্তির শরীর ও মুখমণ্ডল এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে পরিবারের সদস্যরাও এখনো নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পারেননি।
পুলিশ জানিয়েছে,আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) এবং প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। চরবাগডাঙ্গা ও পাশ্ববর্তী এলাকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকাও যাচাই করা হচ্ছে। ৫ নাশকতার আশঙ্কা ও গোয়েন্দা নজরদারি সামনে কোনো বিশেষ দিবস বা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নাশকতার উদ্দেশ্যে এই বোমাগুলো তৈরি করা হচ্ছিল কি না, তা গুরুত্বের সাথে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় ককটেল তৈরির কাঁচামাল চোরাপথে এসেছে কি না,সে বিষয়েও বিজিবি সতর্ক নজরদারি শুরু করেছে। ঘটনাস্থলে যাওয়া,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য,জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। বিকেলের মধ্যে পুরো এলাকা ঘিরে রেখে চিরুনি অভিযান চালানো হতে পারে। আমরা ঘটনার মূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।” — সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা।
এসএম রুবেল অনুসন্ধানী প্রতিবেদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ। মোবাইল নাম্বার- ০১৭৫৬৯১১৯৪৬।