
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ
বায়েজিদ জোয়ার্দার
দখল, দূষণ আবর্জনায় চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে চুয়াডাঙ্গার প্রধান নদী মাথাভাঙ্গা। একসময়ের খরস্রোতা ও প্রাণবন্ত নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে চিকন নালায় পরিণত হয়েছে। নদীর দুপাড় দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীর মাছ ও জীববৈচিত্র পড়েছে হুমকির মুখে।
জানা যায়, মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে জেলার অন্য নদীগুলোর সংযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তসীমান্ত নদী মাথাভাঙ্গা। এ নদী না বাঁচাতে পারলে পানির সংকটে পড়তে হবে জেলার সাধারণ মানুষদের। পানি না থাকায় কৃষিতে সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফসল উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। নদী থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির মাছ। মাথাভাঙ্গা নদী বর্তমানে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নদীর দুই পাড় দখল করে বাগান, ফসল চাষ, বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।
মাথাভাঙ্গা নদী দ্রুত খনন সম্ভব না হলে আগের জায়গায় ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। নদী ভরাট হওয়ায় বর্ষা মৌসুমেও পানি অল্প থাকে। অন্য সময় যে কেউ হেঁটেই নদীর পার হতে পারবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তসীমান্ত নদী মাথাভাঙ্গা। ভারতের মুর্শিদাবাদ হয়ে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ায় অংশে বয়ে গেছে মাথাভাঙ্গা নদী। মাথাভাঙ্গা নদীর চলতি দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার অংশ রয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। নদীর পানি এক সময় কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। বর্তমানে হাঁটুর ওপরে ও নিচে পানি থাকে। নানা কারণে খরস্রোতা নদী এখন মৃত। এক সময় এ নদী দিয়ে ছোট-বড় নৌযান চলাচল করতো। এখন নদীতে ছোট নৌকা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
নদীর সঙ্গে পৌর এলাকার ড্রেনেজ লাইনগুলো যুক্ত রয়েছে। ড্রেনের দূষিত পানি ২৪ ঘণ্টা নদীতে পড়ছে। দূষিত পানি, প্লাস্টিকের বোতল, বর্জ্য, পলিথিনসহ ক্ষতিকর জিনিস ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে আসে। বাজার, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হয় নদীতে। বাজারে পশুর সব বজ্র নদীতে ফেলা হয় নিয়মিত। ময়লা আবর্জনার স্তূপ করে রাখা হয়েছে নদীর পাড়ে। এক সময়ের স্বচ্ছ নদীর পানি কালো হয়েছে। নদীর তলদেশে প্লাস্টিকের বর্জ্যর স্তূপে পরিণত হয়েছে।
মাথাভাঙ্গা নদীর দুই পাড়ের শত শত বিঘা জমি স্থানীয়দের দখলে। নদীর পাড়ে বাগান, পাকা বাড়ি, স্থাপনা নির্মাণ ও ফসল চাষ করেন। বছরের পর বছর অবৈধভাবে জমি দখল করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এক শ্রেণির মানুষ নদীতে বাঁধ, ও বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ চাষ করায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদী এখন চিকন নালায় পরিণত হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় রয়েছে মাথাভাঙ্গা নদীর ৭৫ কিলোমিটার; আর নদীর দৈর্ঘ্য ১৩৫ কিলোমিটার প্রায়। ভারতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এ নদীটি।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মাদ্রাসাপাড়ার আবুল হোসেন বলেন, ‘ছোট বেলায় নদীতে গোসল করতে ছুটে যেতাম। এখন নদীর পাড়েই আসা যায় না দুর্গন্ধে। পানিতে গোসল করার মত অবস্থা নেই। মানুষ নদীতে দেশী প্রজাতির মাছ শিকার করতো। এখন মাছও চোখে দেখা যায় না। নদীর করুণ অবস্থা দেখে কষ্ট হয়। এটা ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মানুষ নদীর ওপর বেশি অত্যাচার করছে। নদী খনন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নয়তো জেলার প্রাণ শেষ হয়ে যাবে।’
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়া গ্রামের কলিন বলেন, ‘নদীর পানি খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করা হত। এখন পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। নদী বাঁচানো না গেলে প্রকৃতির ওপর প্রভাব পড়বে। সরকার দ্রুত সময়ে নদীটি খনন করার ব্যবস্থা করুক।’
মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজান আলী বলেন, ‘নদীটি দেখে কষ্ট হয়। নদী বাঁচাতে আমরা দীর্ঘ দিন আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছি। নদীর প্রাণ ফিরিয়ে দিতে কাজ করছি। নদী এখন ভালো কাজে ব্যবহার করা হয় না। খারাপ কাজের জন্য সবাই ব্যবহার করছে। কিছু মানুষের উদাসিনতার কারণে নদীটি এ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। খনন করে নদী দখল ও আবর্জনার ভাগাড় মুক্ত করা হোক।’

