
মো: তরিকুল ইসলাম
মহম্মদপুর(মাগুরা) প্রতিনিধি
মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার খালিয়া–রহমতপুর কবরস্থান আজ শুধু একটি দাফনস্থল নয়; এটি গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের ত্যাগ, ঐক্য ও বিশ্বাসের জীবন্ত স্মারক। স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই একটি সাধারণ মুসলিম কবরস্থানের স্বপ্ন লালন করে আসছিল খালিয়া ও রহমতপুর গ্রামের মানুষ। নানা সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয় বিরোধ ও মতানৈক্যের কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
স্বাধীনতার পর গ্রামের সাধারণ মানুষ তোশের মণ্ডল নিজের পৈতৃক জমি কবরস্থানের জন্য দান করলে নতুন করে আশার আলো জ্বলে ওঠে। তাঁর এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামবাসী একত্রিত হন। কেউ জমি দেন, কেউ অর্থ সহায়তা করেন, কেউ আবার শ্রম ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে পাশে দাঁড়ান। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত জমি ক্রয় করা হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বর্তমান খালিয়া–রহমতপুর কবরস্থান।
এই মহৎ উদ্যোগে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই অংশ নিলেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল দরিদ্র মানুষের দান। এক দিনের মজুরি, এক মুঠো চাল কিংবা কোনো বিধবার একমাত্র ছাগল—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে নিঃস্বার্থ দানশীলতার এক বিরল উদাহরণ। দানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তোশের মণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আবদুর রহিম মোল্লা। গ্রামবাসীরা জানান, অনেকেই রসিদ ছাড়াই দান করেছেন, কারণ তাঁদের বিশ্বাস ছিল মানুষের ওপর।
মৌসুমি বন্যা থেকে রক্ষার জন্য কবরস্থানটি উঁচু ভেটিতে নির্মিত। বর্ষায় সবুজ ঘাসে ঢাকা কবর আর হেমন্তে ঝরা শিউলি ফুলের সৌরভ কবরস্থানকে করে তোলে শান্ত ও পবিত্র। এখানে নেই কোনো জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা—শুধু একটি টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর, যেখানে জানাজার সামগ্রী সংরক্ষণ করা হয়। চারপাশে থাকা শিউলি, বেল ও হিজলগাছ বহু বছর আগে স্থানীয় শিশুদের হাতে রোপিত।
তোশের মণ্ডলের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে চাঁদ মণ্ডল দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ২০১৭ সাল থেকে গঠিত কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক সাগর মণ্ডল ও কোষাধ্যক্ষ দুদু বিশ্বাসের নেতৃত্বে সুষ্ঠুভাবে কবরস্থানের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, খালিয়া–রহমতপুর কবরস্থান আজ গ্রামের হৃদয়। এটি প্রমাণ করে—চিরস্থায়ী স্মৃতি পাথরের সৌধে নয়, বরং মানুষের সম্মিলিত বিশ্বাস, ত্যাগ ও ঐক্যের মধ্যেই বেঁচে থাকে।
