
সুবাস ছড়াচ্ছে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ গুড়ের হাট
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ
বায়েজিদ জোয়ার্দার
শীতের হালকা কুয়াশা ভেদ করে ভোরের আলো ফুটতেই চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে এক আলাদা ঘ্রাণ—খাঁটি খেজুর গুড়ের সুবাস। কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য বুকে ধারণ করা এই হাটে শীত এলেই ফেরে প্রাণচাঞ্চল্য।
মাটির ভাঁড়ে সাজানো ঝোলা গুড়, নলেন পাটালি আর ধামা-কাঠায় রাখা টাটকা গুড়ে ভরে ওঠে পুরো হাট এলাকা। গুড়ের মৌ মৌ ঘ্রাণে সুবাসিত হয়ে থাকে চারদিক। এরই মাঝে হাঁকডাক, দরকষাকষি আর ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততায় সরোজগঞ্জ হয়ে ওঠে চুয়াডাঙ্গার শীতকালীন অর্থনীতির এক জীবন্ত কেন্দ্র।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিনশ বছর ধরে চলমান সরোজগঞ্জ খেজুর গুড়ের হাট প্রতি সপ্তাহে বসে দুই দিন—সোমবার ও শুক্রবার। প্রতিটি হাটে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার বেশি গুড় কেনাবেচা হয়। চলতি মৌসুম শেষে এখানকার মোট লেনদেন ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা বাজার-সংশ্লিষ্টদের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাটজুড়ে সাজানো রয়েছে নানা ধরনের গুড়—ঝোলা গুড়, নলেন পাটালি, শক্ত পাটালি, তরল গুড় ইত্যাদি। রঙ, ঘনত্ব ও ঘ্রাণে পার্থক্য থাকায় ক্রেতারা গুড় হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে কিনছেন। কেউ এসেছেন সাইকেলে, কেউ ভ্যানে, আবার কেউ মাথায় করে গুড় এনে বসেছেন বিক্রির জন্য। খেজুর গুড়ের স্বাদ আর বিশুদ্ধতার কারণেই সরোজগঞ্জের এই হাটের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে।
বর্তমানে মানভেদে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। ১২ থেকে ১৬ কেজি ওজনের প্রতিটি মাটির ভাঁড়ের দাম পড়ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা। নলেন পাটালি বিক্রি হচ্ছে রকমফেরে ৩০০ থেকে ৪৩০ টাকায়। এখান থেকে সংগৃহীত গুড় সরবরাহ করা হচ্ছে ঢাকা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, পাবনা, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, সিলেট, খুলনা, ময়মনসিংহ, মাগুরা, রাজবাড়ী ও পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
শত বছর পেরিয়েও গুড় তৈরির প্রক্রিয়ায় এখনও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। ঐহিত্যবাহী সনাতন পদ্ধতিতে গুড় তৈরি করা হয় বলেই গুড়ের স্বাদ-গন্ধও থাকে অটুট।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরাবাড়িয়া গ্রামের গুড় প্রস্তুতকারক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, খেজুর গাছ থেকে সংগ্রহ করা রস টিনের জালায় রেখে চুলায় জাল দেওয়া হয়। রস ঘন হয়ে এলে নাড়াচাড়া করে তৈরি হয় খাঁটি গুড়। তিনি বলেন, ‘বংশপরম্পরায় আমরা এই পুরোনো পদ্ধতিতেই গুড় তৈরি করি।’
হাটে আসা ক্রেতাদের মধ্যেও রয়েছে আস্থার গল্প। পাবনা থেকে আসা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরোজগঞ্জের গুড় খাঁটি হওয়ায় প্রতি বছর এখান থেকেই কিনি। দাম কিছুটা বেশি হলেও মানের দিক থেকে এখানকার গুড় সেরা।’
গাছীদের কাছেও এই মৌসুম মানে ব্যস্ত সময়। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বালিয়াকান্দি গ্রামের গাছী জামাল উদ্দিন বলেন, ‘এইবার ৩৫টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করিছি। এসব গাছ থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি গুড় হবে বলে আশা করতিছি।’
স্থানীয় গুড় ব্যবসায়ী উজ্জ্বল কুমার অধিকারী বলেন, বংশপরম্পরায় তারা জেনে আসছেন—সরোজগঞ্জের এই হাট প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো এবং এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ খেজুর গুড়ের হাট হিসেবে পরিচিত।
হাট পরিচালনাকারী মো. আলাউদ্দিন আলা জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকার ও ব্যাপারীরা এই হাটে আসেন। প্রতি হাটে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার গুড় বেচাকেনা হয়। এই সময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৭০০ টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ‘কৃষকরা চিনিমুক্ত খাঁটি গুড় উৎপাদন করছেন। ভেজাল রোধে আমাদের নিয়মিত নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চৈত্র মাস পর্যন্ত সরোজগঞ্জের খেজুর গুড়ের হাটে এই বেচাকেনা অব্যাহত থাকবে। শীতের শেষ প্রান্তে এসেও তাই সরোজগঞ্জে থামে না খাঁটি গুড়ের ঘ্রাণ আর শতবর্ষী এক ঐতিহ্যের ব্যস্ততা।