
শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সমাজ-পাঠ—এই তিন ধারাকে একত্র করে তিনি মানুষের ভেতরের মানুষকে বোঝার চেষ্টা করেন এবং সেই বোঝাপড়া থেকেই তাঁর লেখালেখি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে)
-এর সঙ্গে কথোপকথন
প্রশ্ন ১: আপনার শিক্ষা জীবনের শুরু ও বিকাশ কীভাবে হয়েছে?
উত্তর:
আমার শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই আমি মানুষকে পড়তে শিখেছি। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পারিবারিক পরিবেশেই পড়াশোনা করেছি। এরপর স্কুলজীবনে পড়েছি তিনটি ভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। মানুষের বাড়িতে লজিং থেকে থেকেছি, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। এই পথচলাই আমাকে শিখিয়েছে—শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবন, মানুষ আর সংগ্রাম—এই তিনটি ছিল আমার প্রকৃত পাঠ্যবই।
প্রশ্ন ২: আপনি বলেন—“মানুষকে পড়তে পারলে আর বই পড়ার দরকার হয় না”—এই দর্শনটি কীভাবে গড়ে উঠল?
উত্তর:
আমি মানুষের বেদনা, চিন্তা, চেতনা, আগ্রহ, ভয় ও স্বপ্ন খুব কাছ থেকে দেখেছি। এসব বুঝতে পারলে সমাজ নিজেই একজন শিক্ষক হয়ে ওঠে। অবশ্যই আমি বই পড়েছি, মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষকে যেভাবে গভীরভাবে পড়েছি, সেই অভিজ্ঞতা কোনো বই একা দিতে পারে না। মানুষই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাঠ্যপুস্তক।
প্রশ্ন ৩: বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আপনাকে কী শিখিয়েছে?
উত্তর:
বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা ঘুরে আমি নানা সমাজ ও শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশেছি। তাদের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, ভয় ও স্বপ্ন কাছ থেকে দেখেছি। দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে—নীতি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব মানুষকে বুঝতে হয়।
প্রশ্ন ৪: বিদেশ ভ্রমণ আপনার চিন্তায় কী প্রভাব ফেলেছে?
উত্তর:
বিদেশে গিয়ে দেখেছি—মানুষের মৌলিক চাহিদা সর্বত্র প্রায় এক, কিন্তু সমাজ গঠনের পদ্ধতি ভিন্ন। এই তুলনামূলক অভিজ্ঞতা আমাকে আরও বাস্তববাদী ও মানবিক করেছে। একই সঙ্গে নিজের দেশ ও সমাজকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই কি আপনাকে সরকারি চাকরির বাইরে এনে দিয়েছে?
উত্তর:
নিশ্চয়ই। আমি কখনো পরীক্ষানির্ভর বা ইন্টারভিউনির্ভর জীবনে নিজেকে খুঁজে পাইনি। একবার নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ভাইভাতে সফল হইনি। তবে সেটিকে আমি ব্যর্থতা মনে করিনি। তখনই বুঝেছি—আমার কাজের জায়গা হবে মানুষের মাঝেই, ফাইল আর কাগজের ভেতরে নয়।
প্রশ্ন ৬: চট্টগ্রাম মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল প্রেরণা কী ছিল?
উত্তর:
সমাজ পাঠ থেকেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। আমি দেখেছি—শিশুদের শিক্ষা অনেক সময় ভীতিকর ও আনন্দহীন হয়ে পড়ে। অথচ শিশুদের শেখার প্রধান মাধ্যম হওয়া উচিত আনন্দ ও নিরাপত্তা। তাই এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে চেয়েছি, যেখানে শিক্ষা হবে মানবিক, আনন্দময় ও নিরাপদ। চট্টগ্রাম মডেল স্কুল সেই দর্শনেরই বাস্তব রূপ।
প্রশ্ন ৭: আপনি যেভাবে মমতা ও মাতৃস্নেহ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচালনা করেন—এর উৎস কী?
উত্তর:
এটা কোনো কৌশল নয়, এটা আমার জীবনদর্শন। মানুষকে পড়তে পড়তেই বুঝেছি—ভয় দিয়ে মানুষ তৈরি হয় না, ভালোবাসা দিয়েই মানুষ গড়ে ওঠে। পরিবার থেকে পাওয়া শিক্ষা আর সমাজে ঘুরে ঘুরে শেখা অভিজ্ঞতাই আমাকে এই পথ দেখিয়েছে।
প্রশ্ন ৮: আপনি চাইলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হতে পারতেন—সে পথে যাননি কেন?
উত্তর:
আমি স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কাজ করতে চেয়েছি। সরকারি কাঠামোর ভেতরে অনেক ভালো কাজ হয়, তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে। আমি চেয়েছি নিজের দর্শন অনুযায়ী শিশুদের জন্য একটি মানবিক ও সৃজনশীল শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে।
প্রশ্ন ৯: সাংবাদিকতায় আপনার দক্ষতার পেছনে কী কাজ করেছে?
উত্তর:
আমি ক্লাসরুম ট্রেনিংয়ের চেয়ে জীবন ট্রেনিং বেশি পেয়েছি। সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা—সবকিছু বাস্তবভাবে দেখেছি ও অনুভব করেছি। নিয়মিত পড়া, লেখা ও পর্যবেক্ষণই আমার সাংবাদিকতার মূল শক্তি।
প্রশ্ন ১০: আপনার লেখা মানুষের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে—এর রহস্য কী?
উত্তর:
আমি যা লিখি, তা আগে নিজের ভেতর দিয়ে যাচাই করি। মানুষের কথা, সমাজের কথা, বাস্তবতার কথা—সহজ ও হৃদয়ছোঁয়া ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমার বিশ্বাস—হৃদয় থেকে লেখা হলে তা হৃদয়েই পৌঁছায়।
#(পরিচিতি
এম. নজরুল ইসলাম খান
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক, চট্টগ্রাম মডেল স্কুল
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন সোসাইটি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক
মহাসচিব, বাংলাদেশ সাংবাদিক ক্লাব