মানবজীবন এক অবিরাম সংগ্রামের নাম। এই সংগ্রাম শুধু বাইরের জগতের সঙ্গে নয়—বরং নিজের ভেতরের সঙ্গেও। মানুষের অন্তরে যেমন কল্যাণের প্রবণতা রয়েছে, তেমনি আছে কিছু কুপ্রবৃত্তি, যা তাকে সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায়। এই কুপ্রবৃত্তিগুলোকে উসকে দেয় যে অদৃশ্য শক্তি, কুরআনের ভাষায় তাকে বলা হয়েছে শয়তান।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষ নিজে শয়তান নয়। বরং মানুষের ভেতরে থাকা দুর্বলতা, যেমন অহংকার, হিংসা, লোভ ও প্রতারণার প্রবণতাই শয়তানের প্ররোচনায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই শয়তানকে চেনা মানে নিজের ভেতরের সেই নেতিবাচক দিকগুলোকে চিনতে শেখা।
শয়তানের সূচনা: ইবলিসের অবাধ্যতা
শয়তানের মূল পরিচয় ইবলিস। আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সেজদা করতে নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিস অহংকারে সেই আদেশ অমান্য করল। সে বলল—“আমি আগুন থেকে সৃষ্টি, আর সে মাটি থেকে।” এই অহংকার ও অবাধ্যতার কারণেই সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
এই ঘটনায় আমরা শয়তানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই—অহংকার, হিংসা ও সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা।
শয়তানের কৌশল ও মানুষের কুপ্রবৃত্তি
১. অহংকার (কিবর):
শয়তানের প্রথম অস্ত্রই হলো অহংকার। যখন মানুষ নিজেকে বড় মনে করে, অন্যকে তুচ্ছ ভাবে এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে চায় না—তখন সে এই কুপ্রবৃত্তির শিকার হয়।
২. হিংসা (হাসাদ):
অন্যের ভালো সহ্য না করা শয়তানের একটি প্রধান কৌশল। মানুষের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যায়—অন্যের সাফল্যে কষ্ট পাওয়া, ঈর্ষান্বিত হওয়া।
৩. প্রলোভন ও প্রতারণা:
শয়তান সরাসরি মন্দের দিকে আহ্বান করে না। বরং সে খারাপ কাজকে আকর্ষণীয় করে তোলে, যেন মানুষ নিজেই ভুল পথে পা বাড়ায়।
৪. ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত করা:
শয়তান একবারেই মানুষকে পথভ্রষ্ট করে না। সে ধীরে ধীরে মানুষের মনে সন্দেহ, অলসতা ও গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
৫. দুর্বল মুহূর্তে আঘাত:
রাগ, হতাশা, লোভ—এই সময়গুলোতে মানুষ সবচেয়ে দুর্বল থাকে। শয়তান এই সুযোগগুলোই কাজে লাগায়।
৬. সত্যকে বিকৃত করা:
শয়তান মিথ্যাকে সত্যের মতো উপস্থাপন করে, ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং ভুলকে সঠিক মনে করে।
মানুষের অন্তর্জগত: কুপ্রবৃত্তি বনাম বিবেক
মানুষের ভেতরে সবসময় একটি দ্বন্দ্ব কাজ করে—একদিকে বিবেক ও সৎ প্রবৃত্তি, অন্যদিকে কুপ্রবৃত্তি। শয়তান এই কুপ্রবৃত্তিকে শক্তিশালী করতে চেষ্টা করে।
যখন একজন মানুষ অহংকারে অন্ধ হয়, হিংসায় জ্বলে, অন্যায়কে গ্রহণ করে—তখন তার ভেতরের কুপ্রবৃত্তিই প্রাধান্য পায়। আবার যখন সে নিজেকে সংযত রাখে, সত্যকে গ্রহণ করে, অন্যের ভালো চায়—তখন তার মানবিক ও নৈতিক গুণাবলি বিজয়ী হয়।
কুরআনের দৃষ্টিতে প্রতিরোধের পথ
কুরআন মানুষকে শুধু সতর্কই করেনি, বরং প্রতিরোধের পথও দেখিয়েছে—
আল্লাহর স্মরণ (যিকির)
নামাজ ও ইবাদতে নিয়মিততা
সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা
অহংকার, হিংসা ও লোভ থেকে নিজেকে সংযত রাখা
আত্মসমালোচনা ও আন্তরিক তওবা।
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু—তবে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব মানুষের অন্তরে। তাই শয়তানকে চেনা মানে নিজেকে শয়তান বলা নয়; বরং নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি ও দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা।
এই উপলব্ধিই মানুষকে সচেতন করে, তাকে উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করে এবং আল্লাহর নৈকট্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
শয়তানের কৌশল বুঝে যে ব্যক্তি নিজের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—সেই প্রকৃত অর্থেই সফল ও সচেতন মানুষ।
(লেখক:শিক্ষক ও সাংবাদিক)