এম. নজরুল ইসলাম খান
( শিক্ষক ও সাংবাদিক)
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শতভাগ পাস, বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ কিংবা দেশসেরা ফলাফল অর্জন এখন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনামের অন্যতম মাপকাঠি। তবে সাম্প্রতিক একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য ও অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে—ভালো ফলাফলের প্রতিযোগিতায় কোথাও কোথাও অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে প্রায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন নিবন্ধিত হয়েছিল। অথচ ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেছে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন। অর্থাৎ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। শুধু সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ক্ষেত্রেও এ ব্যবধান উল্লেখযোগ্য।
তবে নিবন্ধিত ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যার পার্থ্যক্য দেখেই কোনো প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, আর্থিক বা পারিবারিক সমস্যা, অসুস্থতা এবং অন্যান্য বাস্তব কারণেও অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল ফলাফলের আশঙ্কায় শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার বাইরে রাখা হয়ে থাকলে সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়।
প্রতিবেদনে আলোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস, নরসিংদী; নরসিংদী সানবীম স্কুল; ঘোড়াদিয়া হাই স্কুল; নরসিংদী মডেল হাই স্কুল; ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ; মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানের নাম প্রতিবেদনে আসা মানেই তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি বলা যাবে না।
বিশেষ করে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ফলাফল অত্যন্ত ভালো। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ২৯৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯৪ জনের জিপিএ-৫ পাওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফল নিয়েও সংবাদমাধ্যমে শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ফলে একই সঙ্গে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যার পার্থক্য নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়াকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের হার ভালো রাখার উদ্দেশ্যে এসএসসি পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে তা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ কারণে শিক্ষা বোর্ডের কাছে দাবি উঠেছে—কোনো প্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, এসএসসি পরীক্ষায় ফরম পূরণকারী এবং বাস্তবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা তুলনা করে দেখা হোক। অস্বাভাবিক ব্যবধান পাওয়া গেলে তার কারণ যাচাই করা হোক। অভিযোগ সত্য হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখাও জরুরি।
শিক্ষার সাফল্য শুধু ‘শতভাগ পাস’ বা ‘শতভাগ জিপিএ-৫’ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় সাফল্য হলো—দুর্বল শিক্ষার্থীকে বাদ না দিয়ে তাকে উন্নতির সুযোগ দেওয়া।
সুনাম অর্জিত হোক শিক্ষার মান, মানবিকতা, নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে; কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে বাদ দিয়ে নয়।