পরীক্ষার পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক,শিক্ষক এমনকি আত্মীয়-স্বজন অনেকেই প্রতীক্ষায় থাকে রেজাল্টে নাম্বার কত হবে,কিনা কি পায় তারজন্য। প্রার্থনা করে ভালো নাম্বার পাওয়ার জন্য।কেউ কেউ দান-খয়রাত করে থাকেন প্রত্যাশিত ফলাফলের জন্য। শিক্ষার যে আসল কথা যোগ্যতা, দক্ষতা, মানবিকতা, মনুষ্যত্বের বিকাশ সে বিষয় চিন্তা অনেকেই করে না।রেজাল্ট কার্ডে কত নাম্বার পেল সেদিকে নজর বেশি থাকে। রেজাল্ট যেন ভালো হয়, আশানুরূপ হয় সেই প্রার্থনা করে। কিন্তু পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা,অধ্যাবসয় এসব ছাড়া কেউ কি কখনো নাম্বারের ভিত্তিতে বড় হতে পেরেছেন।যাদের রেজাল্ট কার্ডের নাম্বারটাই শিক্ষার মূল অর্জন মানুষ হওয়া বিষয়টি যাদের মাথায় থাকে না তারা শিক্ষিত নয়, আসল কথা হচ্ছে তারা শিক্ষা অর্জন করেনি। ফলাফল নির্ভর বা নাম্বারের হিসাব নিয়ে যে শিক্ষা সে শিক্ষা যোগ্যতা, মানবিকতা নির্মাণের শিক্ষা নয়।শুধু রেজাল্টই নয় মানুষ করে গড়ে তোলাই শিক্ষা।
একটি উজ্জ্বল রেজাল্ট কার্ড নিঃসন্দেহে আনন্দের, তবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একজন শিক্ষার্থীর মানবিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশ। প্রকৃত শিক্ষা কেবল নাম্বার অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষা হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যা একজন শিশুকে দায়িত্বশীল নাগরিক ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
অধিকাংশ অভিভাবকই চান তাঁদের সন্তান ভালো ফল করুক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভালো ফল মানেই কি ভালো শিক্ষা? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময় উচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী জীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জে ব্যর্থ হয়, আবার গড় ফলের শিক্ষার্থী যোগ্যতা, সততা ও নেতৃত্বগুণে সমাজে সফল হয়। এখানেই ফলাফলনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়।
শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে অভিভাবকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেবল পরীক্ষার আগে ভালো রেজাল্টের প্রত্যাশা নয়, বরং সন্তানের দৈনন্দিন পড়াশোনা, আচরণ, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, ডিজিটাল আসক্তি, উপস্থিতি এবং শেখার অগ্রগতি—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা অভিভাবকের দায়িত্ব। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে শুধুমাত্র ভালো নম্বর আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
পরীক্ষা কোনো শিক্ষার শেষ কথা নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি নির্ণয়ের একটি মাধ্যম। পরীক্ষার খাতা হলো শেখার একটি দরজা—যেখানে ভুল থেকে সংশোধন ও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। নাম্বার বেশি পেলেই খুশি হওয়া নয়, বরং শিশুটি কী শিখল, কোথায় দুর্বল, কীভাবে উন্নতি সম্ভব—সেদিকে নজর দেওয়াই প্রকৃত অভিভাবকত্ব।
শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে একটি শিশুকে প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে। ভালো শিক্ষক দিকনির্দেশনা দেন, সচেতন অভিভাবক পরিবেশ তৈরি করেন এবং মনোযোগী শিক্ষার্থী সেই সুযোগকে কাজে লাগায়। এই ত্রিমুখী সমন্বয় ছাড়া মানসম্মত ও যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা সম্ভব নয়।

অতএব, প্রথম হওয়া বা শ্রেণিতে ফার্স্ট করাই শিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো—শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ, নৈতিকতা অর্জন এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হওয়া। তাই বলা যায়, ভালো রেজাল্ট কার্ডের চেয়েও দক্ষ, যোগ্য ও মননশীল শিক্ষার্থী গড়ে তোলাই শ্রেয়।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় পাশ করা নয়—
আমাদের অভিভাবকদের, শিক্ষকদের এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের দৃষ্টি রাখতে হবে সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক এবং রেজাল্ট কার্ডের বাইরে গিয়ে মনুষ্যত্বের শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা কতটুকু এগিয়েছে।রেজাল্ট বা নাম্বার পাওয়াটাই মূল কথা নয় আসল শিক্ষা হচ্ছে মানুষ হয়ে গড়ে ওঠা বা মানুষ করে গড়ে তোলা।
তাই আমরা বলতে পারি, 'নম্বরের হিসাব নয় মনুষ্যত্বের অর্জনে শিক্ষা'।
(লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক নেতা)