এম. আনোয়ার হোসেন:
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এর ওয়ার্কচার্জড কর্মচারীকে স্থায়ী করার প্রক্রিয়া নিয়ে চরম তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি চাকরি স্থায়ীকরণের ৭৫ জন কর্মচারীর এই তালিকায় দেদারসে জায়গা করে নিয়েছেন ফৌজদারি মামলার এজাহারনামীয় আসামিরা। শুধু তাই নয়, গুরুতর অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি মূলক ব্যবস্থা না নিয়ে অবৈধভাবে পদায়ন করার নজিরও স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ প্রশাসন।
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিটিসিএল-এর শের-এ-বাংলা নগর ডিজিএম কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আজও কোনো বিভাগীয় বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বিটিসিএল প্রশাসন সেই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিটিসিএল-এর স্থায়ী হতে যাওয়া ৭৫ জনের তালিকার অন্যতম বিতর্কিত নাম মোর্শেদ আলম মুন্সি, যার বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ফৌজদারি মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এজাহারনামীয় আসামি আব্দুস সোবহান ও আব্দুল হালিমকে নিয়মবহির্ভূতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে এই অভিযুক্তরা চাকরি স্থায়ীকরণের চূড়ান্ত কনফার্মেশনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ফৌজদারি মামলার আসামিরা যেখানে আইন অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত থাকার কথা, সেখানে তাদের পুরস্কৃত করে স্থায়ী করার প্রক্রিয়া বিটিসিএল-এর স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের চাকরী স্থায়ী করার চেষ্টা বিটিসিএল প্রশাসন কার্যত মেরুদণ্ডহীনতার পরিচয় দিয়েছে এবং পুরো প্রতিষ্ঠানটি এখন একটি অপরাধী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে, যা বিটিসিএল প্রশাসনের চরম অসহায়ত্ব ও মেরুদণ্ডহীনতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বিটিসিএল-এর প্রধান কার্যালয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ মাহমুদুল হকের কক্ষে অনধিকারভাবে প্রবেশ করে একদল কর্মচারী মব সৃষ্টি করে। তারা এমডি’র সাথে অত্যন্ত অশালীন ও খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করে এবং তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান করে।
ভিডিওর সূত্র ধরে জানা যায়, শের-এ-বাংলা নগর ডিজিএম কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত আহমেদ ফজলে রাব্বি, আব্দুস সোবহান এবং মোর্শেদ আলম মুন্সি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে এমডি-কে শাসাচ্ছেন। দুর্নীতির দায়ে ইতিমধ্যে বদলি হওয়া মোর্শেদ আলম মুন্সিসহ অন্যান্য কর্মচারীদের পুনর্বহালের আদেশ দিতে তারা এমডি-কে বাধ্য করার চেষ্টা চালান।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, আহমেদ ফজলে রাব্বি ও সোবহানের এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না বিটিসিএল প্রশাসন। এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে থাকার কারণেই বিটিসিএল-এ ক্যাবল চুরি, সরকারি সম্পত্তি জবরদখল ও বদলি বাণিজ্যসহ সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি অবাধে চলমান রয়েছে।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে বা চার্জশিট দাখিল হলে তাকে স্বপদে বহাল রাখা বা পদোন্নতি-স্থায়ীকরণ করা সরকারি বিধি-বিধানের চরম লঙ্ঘন। বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের এমন অপেশাদার ও নির্লিপ্ত আচরণ প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল অবিলম্বে ভাইরাল হওয়া ভিডিও পর্যালোচনা ও তদন্ত সাপেক্ষে অভিযূক্তদের চিহ্নিত করে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এসব বিষয়ে বিটিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বিটিসিএল-এর কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ বা মামলা থাকলে, তা অবশ্যই আইন ও সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হবে। চাকরি স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে এবং মামলার বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যবস্থার আশ্বাস দিলেও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন, যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে এমডি’র কক্ষে ঢুকে হুমকি দেওয়ার পরও অপরাধীরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে আদৌ কোনো সুশাসন ফিরে আসবে কি না, নাকি অপরাধীদের এই সিন্ডিকেটের কাছেই চিরতরে জিম্মি হয়ে থাকবে রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি?