ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিশু সুরক্ষা: চাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ন্যায়বিচার
*এম নজরুল ইসলাম খান*
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল সনদ অর্জনের স্থান নয়; এটি শিশুর মনন, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার নিরাপদ আশ্রয়। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কওমি ও মহিলা মাদ্রাসাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিশু ও নারী শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা জাতির বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। এসব অপরাধের পেছনে ব্যক্তিগত নৈতিক স্খলনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব, জবাবদিহির ঘাটতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিও দায়ী।
বিশেষ করে অপরিসর ভবনে পরিচালিত অননুমোদিত আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ ও নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব শিশুদের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বা ধর্মীয় ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে অপরাধ গোপনের চেষ্টা করা হয়। অথচ ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক কিংবা সামাজিক প্রভাব কোনো অপরাধীর রক্ষাকবচ হতে পারে না।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিশু সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং মানবিকতা, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারই প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি। কয়েকজন অপরাধীর দায়ে গোটা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, আলেম সমাজ কিংবা শিক্ষকগোষ্ঠীকে দোষারোপ করাও অনুচিত। অপরাধী যে-ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গণপিটুনি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা পরিহার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার। প্রথমত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি বা সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অনুমোদন ও নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মহিলা মাদ্রাসায় নারী পরিদর্শক নিয়োগ ও নিয়মিত তদারকি জরুরি। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন, পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই এবং অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের পুনর্নিয়োগ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি আলেম সমাজকে অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং অভিভাবকদেরও সন্তানের নিরাপত্তায় সচেতন থাকতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনো পক্ষের অনুগ্রহ নয়; এটি জাতীয় দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির অজুহাতে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করে অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। নীরবতার দেয়াল ভেঙে গড়ে তুলতে হবে শিশুবান্ধব, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ—যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধের মর্যাদা রক্ষিত হবে এবং প্রতিটি শিশু পাবে সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার।