চুয়াডাঙ্গার দুই আসনই পুনরুদ্ধায় চায় বিএনপি জিতে ইতিহাস গড়ার আশায় জামায়াত
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ
বায়েজিদ জোয়ার্দার
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভারত সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা। ধান, ভুট্টা, পান ও আখ খুলনা বিভাগের এই জেলাটির প্রধান অর্থকরী ফসল। এ জেলার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম চিনিকল কমপ্লেক্স ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। এ প্রতিষ্ঠানটি জেলার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জমে উঠেছে জেলার নির্বাচনী প্রচারণা। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই দলীয় প্রার্থীরা ছুটছেন নির্বাচনী এলাকার গ্রাম-মহল্লা শহর ও জনপদে। এমনকি ভোটারদের বাড়ি বাড়ি। চায়ের দোকানে, হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্রই এখন প্রার্থীদের পদচারণায় মুখরিত। অন্তর্বর্তী সরকার সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করার পরপরই শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। ইতোমধ্যে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জেলায়। বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী চুয়াডাঙ্গায় সংসদীয় আসন দুটি। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী আলোচনা বাড়ছে। তবে দলীয় সভা সমাবেশের কাজে, নিজ দলের নেতাকর্মীর বাইরে ভোটারদের সম্পৃক্ততা ঘটাতে পারেনি দলগুলো। দেশ স্বাধীনের পর থেকে ভারতবিরোধী মানসিকতার ভোটাররা কখনোই ভারতের পক্ষে অবস্থান নেয়া দলগুলোকে ভোট দেয়নি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, ফ্যাসিস্টদের পতনের পর দুটি আসনই নির্বাচনী কর্মকা-ে শক্ত অবস্থান রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যেটা ভোটের পারদ ওঠা-নামার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে বড় দল হিসেবে নির্বাচনী কর্মকা-ে থেমে নেই বিএনপি। এ দলের নেতাকর্মীরাও চালিয়ে যাচ্ছে তাদের সংঘবদ্ধ নির্বাচনী কাজ।
চুয়াডাঙ্গা-১ : জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া, মোমিনপুর, কুতুবপুর, শংকরচন্দ্র ও পদ্মবিলা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটি। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ১১ হাজার ৬৫৭ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৮৫ জন পুরুষ, দুই লাখ ৫৭ হাজার ২৬৫ জন নারী ও সাতজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এই আসনের মোট কেন্দ্র সংখ্যা ১৮০টি।
এই আসনটি একসময় বিএনপির ঘাঁটি ছিল। এখানে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মকবুল হোসেন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে সম্মিলিত বিরোধী দলের মোহাম্মদ শাহজাহান জয়ী হন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আসনটি দখলে রাখে বিএনপি। এর মধ্যে ১৯৯১ সালে মিয়া মোহাম্মদ মনসুর আলী, ১৯৯৬, ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারি ও জুনের নির্বাচনে শামসুজ্জামান দুদু ও ২০০১ সালে শহীদুল ইসলাম বিএনপি থেকে এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন ধারাবাহিকভাবে আসনটিতে জয়ী হন।
সংগত কারণেই বিএনপি নেতাকর্মীদের আশা, আগামী নির্বাচনে তারা ফিরিয়ে আনবে তাদের হারানো আসন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন ভোটের মাঠের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাই মাঠে সক্রিয়। এক সময়ের মিত্র এই দুই দলের মধ্যেই হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এর মধ্যে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও বিশাল কর্মী বাহিনী রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলের ১৭ বছর এখানে জামায়াত এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা শাসকদের ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়ে জেল-জুলুমের মুখোমুখী হয়। সে সময় উভয় দল একত্রে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাস্তবতায় ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন উভয়দলের প্রার্থীরা।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ স¤পাদক তরুণ নেতা শরীফুজ্জামান শরীফ। তিনি জানান, নির্বাচিত হতে পারলে সকলকে সাথে নিয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেবেন তিনি। আলমডাঙ্গা উপজেলায় একটি বড় হাসপাতাল করতে চান শরীফুজ্জামান শরীফ। এ জেলায় পরিপূর্ণ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার শক্ত অবস্থান থাকবেন বলে জানান তিনি।
এ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য ও চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। তরুণ এই সাবেক ছাত্রনেতা ইতোপূর্বে ছাত্রশিবিরের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও গবেষণা-বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। জামায়াত প্রার্থী রাসেল নির্বাচনের মাঠে নামার পর ভোটারদের অবস্থান ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হচ্ছে জানা গেছে। সর্বমহলে প্রশংসিত ও পরিচিত এই তরুণ নেতা চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে ভোট যুদ্ধে সমীকরণ পাল্টে দিতে পারেন বলে মতপ্রকাশ করেছেন ভোটাররা।
জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী চেয়ারম্যান ও একসময় তিনটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান হওয়ার নজির রয়েছে। তাছাড়া প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও ইউনিটভিত্তিক কমিটি গঠনসহ ব্যাপক আকারে প্রচারণা চালিয়ে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। জেলার নির্বাচনী পালে হাওয়া দিয়েছে বর্তমান তারুণ্য-নির্ভর চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াত। সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জয়ী হতে শতভাগ আশাবাদী তারা।
জামায়াত প্রার্থী মাসুদ পারভেজ রাসেল জানান, তিনি নির্বাচিত হতে পারলে চুয়াডাঙ্গাকে একটি রোল মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলবেন। জেলার উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন, আলমডাঙ্গায় একটি ওভার ব্রিজ নির্মাণ, মা ও শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, কৃষকদের বিনা সুদে অর্থ প্রদান, এলাকার অবহেলিত মানুষের উন্নয়নে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মাওলানা জহুরুল ইসলাম আজিজিকে এখানে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করলেও, মাঠে তার তেমন নির্বাচনী তৎপরতা চোখে পড়েনি। তবে স্বল্প পরিসরে দলের পক্ষে ভোট চাওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে সাধারণ ভোটারদের মনে এ দলের প্রার্থী কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি বলে জানা গেছে।
জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ মাঠ থেকে হারিয়ে গেলেও মাঠে তৎপর বিএনপি জামায়াত। এ আসনে বিএনপি চায় তাদের হারানো আসন পুনরুদ্ধার, আর জামায়াত চায় আসনটি জিতে নতুন ইতিহাস গড়তে।
চুয়াডাঙ্গা-২ : জেলার দামুরহুদা উপজেলা, জীবননগর উপজেলা এবং সদর উপজেলার তিতুদহ ইউনিয়ন, নেহালপুর, গড়াইটুপি ইউনিয়ন ও বেগমপুর ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনটি। এখানে ১৭৪টি ভোটকেন্দ্রে চার লাখ ৯২ হাজার ৪৩১ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে দুই লাখ ৪৬ হাজার ৭১৬ জন পুরুষ, দুই লাখ ৪৫ হাজার ৭১১ জন নারী ও চারজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এখানকার বেশির ভাগ ভোটার কৃষিকাজের সঙ্গে স¤পৃক্ত। তবে দর্শনা কেরু অ্যান্ড কো¤পানি ও রেলওয়ে এবং স্থলশুল্ক স্টেশনসহ অন্যান্য শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়।
এ আসন থেকে ১৯৮৬ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (সিরাজ) থেকে মীর্জা সুলতানা রাজা, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির হাবিবুর রহমান হবি, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে মাওলানা হাবিবুর রহমান, ১৯৯৬ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি ও ১২ জুন এবং ২০০১ সালে বিএনপির শিল্পপতি মোজাম্মেল হক আসনটি দখল করেন। পরে ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা চারবার আওয়ামী লীগের আলী আজগর টগর এখানে বিজয়ী হন। সংসদ সদস্য টগর ১০ মাফিয়া দিয়ে হাট, ঘাট, বিল দখল-বাণিজ্য, পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়স্বজনদের ক্ষমতায়ন, বিএনপি-জামায়াতসহ ভিন্ন মতের মানুষদের দমন ও চোরাকারবারি নিয়ে ১৭ বছর কাটিয়েছেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চিত্র পাল্টে গেছে। এখন তার পরিবার ও সাথীদের আর খোঁজ পাওয়া যায় না।
এবারের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজিএমইএয়ের সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি ক্লিন ইমেজের মানুষ। সব সময় তিনি রাজনৈতিক ঝামেলা এড়িয়ে চলেন। নোংরামিও পছন্দ নয় তার। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে ভালো আচরণে অভ্যস্ত তিনি। মাহমুদ হাসান খান জানান, নির্বাচিত হলে এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান, খাদ্য হিমাগার, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের নায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ ও বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন তিনি। পাশাপাশি রাস্তাঘাটসহ সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য জেলা আমির রুহুল আমিন। জেলার দুটি আসনের মধ্যে এটি জামায়াতের অধ্যুষিত আসন বলে দাবি করা হয়। আওয়ামী লীগের সকল বাধা উপেক্ষা করে ২০১০ সাল থেকে তিনি এ আসনে কাজ করছেন। জেল-জুলুম, হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে এলাকায় অবস্থান করে দলকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থীকে হারানো কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে চারবার কারাগারে গেছেন রুহুল আমীন। তার সঙ্গে ডজনখানেক শিবিরের জেলা সভাপতি নির্বাচনী কাজ করছেন। তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধায়নে জামায়াতের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াত ব্যাপক কাজ করেছে, সংগঠনের ব্যাপক সংখ্যক কর্মী বর্তমানে নারী।
রুহুল আমিন বলেন, এই জনপদের মেঠো পথেই আমার বেড়ে ওঠা। সংগত কারণেই আমার জানা আছে এখানকার মানুষের চাওয়া-পাওয়া। তারা দুমুঠো মোটা চালের ভাত আর নিরাপদ জীবন চায়। আমি তাদের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এই জেলায় একটি কৃষি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্থলবন্দর বাস্তবায়ন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার উন্নয়ন, লুটপাটের রাজনীতি বন্ধ, চুয়াডাঙ্গা-কালীগঞ্জ সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আধুনিকায়নের মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধ, পতিত জমি প্রকৃত হকদারদের প্রদান, দর্শনাকে উপজেলায় উন্নীতকরণ, একটি সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ সার্বিক বিষয়ে কাজ করতে চাই। আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাসানুজ্জামান সজীবকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তিনি ছেড়ে আসা জোটের বিরুদ্ধে ফেসবুকে সক্রিয় থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে তেমন তৎপর হননি। তবে কিছু নির্বাচনী প্রচারণা করছে এ দলটি।