চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাকাতের জন্য প্রখর রোদে আর্তমানবতার দীর্ঘ লাইন' ধনীদের ‘অনীহা’য় কি তবে হারাবে গরিবের ঈদের হাঁসি?
এসএম রুবেল অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, ইনভেস্টিগেশন টিম অফ ক্রাইম সিন (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) | ১৬ মার্চ, ২০২৬
ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য! বিত্তবানদের অনীহায় ম্লান হচ্ছে অসহায়দের ঈদের আনন্দ বছর ঘুরে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসে পবিত্র রমজান মাস। দীর্ঘ ৩০ দিন সিয়াম সাধনার পর বিশ্ব মুসলিমের দুয়ারে কড়া নাড়ে খুশির ঈদ। যে দিনটি হওয়ার কথা ছিল ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান আনন্দময়। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের চিত্র যেন এক ভিন্ন গল্পের কথা বলছে। এখানে একদিকে যেমন সম্পদশালীদের প্রাচুর্য বাড়ছে,অন্যদিকে তেমনই অভাবের কষাঘাতে জর্জরিত অসহায় মানুষগুলো পথ চেয়ে বসে থাকে সামান্য একটু সাহায্যের আশায়।
সম্পদের পাহাড় বনাম ক্ষুধার্তের হাহাকার: যাকাত আদায়ে কেন এই লৌকিকতা? শিল্পপতিদের বিলাসিতায় ম্লান হচ্ছে মেহনতি মানুষের অধিকার,আমাদের সমাজে বিত্তবান ও শিল্পপতিদের ওপর মহান আল্লাহ তায়ালা যাকাত ফরজ করেছেন। এই যাকাত কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি ধনীদের সম্পদে অভাবী মানুষের ন্যায্য অধিকার। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাসহ দেশজুড়ে এক শ্রেণির সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাদের এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে চরম অনীহা প্রদর্শন করছেন। সঠিক নিয়মে ও সঠিক সময়ে যাকাত আদায় না করায় দরিদ্র মানুষের মুখে ঈদের হাসি ফুটছে না! পরিবার-পরিজন নিয়ে একটি সুন্দর ঈদ কাটানোর যে স্বপ্ন মেহনতি মানুষগুলো দেখে, তা প্রায়শই অপূর্ণ থেকে যায়।
যাকাত কি দয়া নাকি অধিকার? তপ্ত রোদে আর্তমানবতার হাহাকার ও ধনীদের উদাসীনতা,অসহায় ও দুস্থদের অভিযোগ, অনেক বিত্তবান তাদের সম্পদের সঠিক হিসাব করে যাকাত প্রদান করেন না। কেউ কেউ লোকদেখানো সামান্য কিছু সহায়তা দিলেও তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। শিল্পপতি ও ধনীদের এই উদাসীনতা কেবল ধর্মীয় বিধানের লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি সামাজিক অবিচার। যদি সমাজের প্রতিটি সামর্থ্যবান ব্যক্তি তাদের সম্পদের সঠিক অংশ যাকাত হিসেবে বণ্টন করতেন, তবে আজ কোনো শিশুকে ক্ষুধার্ত থেকে ঈদ কাটাতে হতো না,কোনো বৃদ্ধকে যাকাতের আশায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়তে হতো না।
সারাদেশের বর্তমান চিত্র যেন এক চরম বৈষম্যের প্রতিফলন। একদিকে বিত্তবানদের অঢেল সম্পদের প্রদর্শনী, অন্যদিকে সামান্য কিছু যাকাতের আশায় প্রখর রোদে পুড়ছে হাজারো অসহায় মানুষ। তপ্ত রোদে দীর্ঘ লাইন! লাঞ্ছিত মানবতা' সরেজমিনে দেখা যায়, কাঠফাটা রোদে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধ। সামান্য কিছু টাকা বা কাপড়ের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই অপেক্ষা। প্রশ্ন জাগে, যে যাকাত দেওয়ার কথা ছিল দরিদ্রের ঘরে গিয়ে সসম্মানে, তা কেন আজ রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষার মতো সংগ্রহ করতে হচ্ছে? কেন ক্ষুধার্ত ও মেহনতি মানুষগুলোকে প্রখর তাপপ্রবাহের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের অধিকার আদায় করতে হচ্ছে? এটি কেবল যন্ত্রণাদায়কই নয়,বরং মানবতার চরম অবমাননা।
বিত্তবানদের অনীহা ও লোকদেখানো মানসিকতা! অভিযোগ উঠেছে, জেলার অনেক শিল্পপতি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের সঠিক হিসাব করে যাকাত প্রদান করছেন না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাকাতকে তারা কেবল একটি বাৎসরিক লৌকিকতায় পরিণত করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী সম্পদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশ বণ্টন করলে সমাজে দারিদ্র্য বিমোচন হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু এক শ্রেণির সম্পদশালীদের এই 'অনীহা' দরিদ্র পরিবারগুলোর ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিচ্ছে। তারা যদি তাদের প্রাপ্য টুকু ঠিকমতো পেত, তবে আজ তাদের এভাবে রোদে পুড়ে রাজপথে হাহাকার করতে হতো না।
মর্যাদাহীন যাকাত বনাম ইসলামের শিক্ষা,ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, যাকাত দাতার হাত থাকবে নিচে এবং গ্রহীতার সম্মান থাকবে উপরে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। যাকাতের টাকা নিতে এসে গরিবরা কোনো সম্মান তো পাচ্ছেই না, উল্টো ভিড়ের চাপে এবং অব্যবস্থাপনায় তাদের জীবনের ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক বিত্তবান মানুষ যাকাতকে প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা ধর্মীয় ও মানবিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নিন্দনীয়।
বিবেকের কাছে প্রশ্ন! আজ সারা বিশ্ব যখন এই দৃশ্য দেখবে, তখন আমাদের সমাজের তথাকথিত সম্পদশালীদের লজ্জিত হওয়া উচিত। সম্পদ কেবল কুক্ষিগত করে রাখার নাম আভিজাত্য নয়, বরং সেই সম্পদ থেকে অসহায়ের হক আদায় করাই প্রকৃত মনুষ্যত্ব। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই আর্তনাদ যেন বিত্তবানদের কানে পৌঁছায় এবং তারা যেন লোকদেখানো আয়োজনের পরিবর্তে সরাসরি অভাবী মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সসম্মানে যাকাত পৌঁছে দেন। প্রতিটি মেহনতি মানুষের পরিবারে হাসি ফুটলেই সার্থক হবে পবিত্র ঈদের আনন্দ। সতর্কবার্তা! যাকাত দয়া নয়, এটি দরিদ্রের আইনগত ও ধর্মীয় অধিকার। আপনার অবহেলা যেন অন্যের মুখের হাসি কেড়ে না নেয়।
পবিত্র ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করতে হলে ধনীদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি! আপনার উপার্জিত সম্পদে যাদের হক আছে, তাদের সেই হক ফিরিয়ে দিন। যাকাত কোনো অনুদান নয়, এটি বঞ্চিতদের অধিকার। আসুন, আমরা আত্মতুষ্টির ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার খাতিরে এগিয়ে আসি। বিত্তবানদের সুমতি ফিরুক এবং প্রতিটি অসহায় পরিবার হাসিখুশি মনে ঈদ উদযাপন করুক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।।
যাকাত দয়া নয়, সাংবিধানিক ও ধর্মীয় অধিকার! বাংলাদেশ সংবিধানের মূল চেতনা এবং ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, যাকাত কোনো করুণা নয়' বরং এটি দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার। ইসলামের অমোঘ বিধান অনুযায়ী বিত্তবানদের ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ। অথচ চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারা দেশে এক শ্রেণির অসাধু বিত্তবান ও শিল্পপতিরা এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করছেন। তাদের এই অনীহা কেবল ধর্মীয় অবমাননাই নয়,বরং এটি সামাজিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী। সময় এসেছে এই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার।
প্রখর রোদে লাঞ্ছিত মানবতা! জবাব চাই বিত্তবানদের কাছে?সরেজমিনে দেখা যাচ্ছে, প্রখর তাপপ্রবাহের মধ্যে শত শত অসহায় নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধ মানুষ সামান্য সাহায্যের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন। যে যাকাত দেওয়ার কথা ছিল সসম্মানে অভাবীদের দুয়ারে পৌঁছে দিয়ে, তা আজ লাইনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষার মতো গ্রহণ করতে হচ্ছে। তপ্ত রোদে মানুষের এই হাহাকার যেন এক লাঞ্ছিত মানবতার প্রতিচ্ছবি। বিত্তবানদের এই লোকদেখানো মানসিকতা ও লৌকিকতার কারণে আজ গরিবের সম্মান ধুলোয় মিশছে। প্রশ্ন জাগে,দেশের আইন ও ধর্মীয় অনুশাসন থাকা সত্ত্বেও কেন মেহনতি মানুষকে এভাবে অপমানিত হতে হবে?
সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি ও আল্টিমেটাম চাই অবহেলিত অসহায় জনতা' বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা আসা এখন সময়ের দাবি। বিত্তবানরা তাদের সম্পদের সঠিক হিসাব নিরূপণ করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। প্রশাসনকে স্পষ্ট হুশিয়ারি দিতে হবে যে, কোনো শিল্পপতি বা ধনী ব্যক্তি যদি যাকাত প্রদানে অনীহা দেখান বা সঠিক হিসাব গোপন করেন,তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বছর ঘেরা হোক (আল্টিমেটাম) মধ্যে সকল বিত্তবানকে তাদের যাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব পেশ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা বণ্টনের আওতায় আনতে হবে।
সম্পদের হিসাব পেশ ও সুশৃঙ্খল বণ্টনের দাবি? যাকাত ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে হলে প্রতিটি শিল্পপতি ও সম্পদশালী ব্যক্তিকে তাদের বার্ষিক সম্পদের হিসাব সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পেশ করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সেই হিসাব অনুযায়ী গরিবদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন লোকদেখানো বা ভিড় সৃষ্টি করে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা না হয়। যদি প্রতিটি সামর্থ্যবান ব্যক্তি সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করেন, তবে দেশ থেকে দারিদ্র্য চিরতরে মুছে যাবে এবং প্রতিটি অসহায় পরিবার হাসিখুশি মনে ঈদ উদযাপন করতে পারবে।
বিবেকের কাছে প্রশ্ন ও চূড়ান্ত বার্তা! আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, যাকাত দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে কোনো মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক নেই' এটি বঞ্চিতের আইনগত ও ধর্মীয় হক। আপনার বিলাসিতা যেন অন্যের বেঁচে থাকার পথে বাধা না হয়। আসুন, আত্মতুষ্টি আর অহংকার ত্যাগ করে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসি। বিত্তবানদের সুমতি ফিরুক এবং রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারিতে প্রতিটি অভাবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত হোক—এটাই আজকের দিনের দাবি।