নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম মহানগর
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা
বন্ধ এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধ ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নির্মূলে সরকারের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বর্তমান প্রধান বিরোধীদলীয় কেন্দ্রীয় নেতা
মিয়া গোলাম পাওয়ার।
রবিবার (১ মার্চ) বিকাল ৪টায় চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত বিপ্লবের পর এক নতুন পথচলা শুরু করেছি। আমাদের সকলের অঙ্গীকার ছিল রাজনীতিতে সহনশীলতা এবং একে অপরকে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। আমাদের আমিরে জামায়াত চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন- একটি সাইকেল যেমন দুটি চাকা ছাড়া চলতে পারে না, তেমনি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় সরকারি দল এবং বিরোধ হলো দুটি চাকার মতো। এই দুই চাকার মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমেই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের পর আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় চরম অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা লক্ষ্য করছি। বিশেষ করে বিজয়ীরা পরাজিতদের ওপর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করছে, যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। শনিবার ইফতারের পর চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে যে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে, তাতে একজন শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন এবং আরও অনেকেই গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছেন।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী চুয়াডাঙ্গায় যে দুটি আসনে জয়ী হয়েছে, সেখানে পরাজিতদের ওপর কোনো হামলা হয়নি, বরং তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রেখেছে। অথচ অনেক আসনে বিজয়ীরা জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে, কিন্তু তার আগেই যদি আমরা এই সহিংসতা বন্ধ করতে না পারি, তবে যে ২০-৩০ হাজার তরুণের ক্ষতবিক্ষত দেহ আর জীবনের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছে, তা অপূর্ণ থেকে যাবে। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, এই সব সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
পবিত্র মাহে রমজানে চট্টগ্রাম মহানগরীর ইফতার মাহফিলে উপস্থিত সবাইকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, রমজান মাস মূলত আত্মশুদ্ধির মাস, যেখানে আমরা আমাদের জীবন, চিন্তা এবং প্রবৃত্তিকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করার সুযোগ পাই। আমাদের হায়াতের অবশিষ্ট সময়টুকু যেন আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা ও রহমত দিয়ে পূর্ণ করে নিতে পারি এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারি, এটাই হোক আমাদের আজকের প্রার্থনা। চট্টগ্রাম থেকে শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বরং সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর ওপর যে নির্মমতা চলছে, তার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইহুদিবাদী ইসরায়েল এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যৌথভাবে মুসলিম বিশ্বের ওপর যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামী এবং ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে যে হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আমরা সকল শহীদের জান্নাতের উচ্চ মাকাম কামনা করছি।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক আলোচনার চেয়েও আজ আমাদের বড় প্রয়োজন শান্তি ও ইনসাফ কায়েম করা। মিয়া গোলাম পরওয়ার সবাইকে মিলেমিশে একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিনের সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী এমপি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, মাহে রমজান থেকে আমরা নিজের জীবন গড়ার শপথ নিবো, সেই সাথে নবনির্বাচিত সরকার ও বিরোধীদল মিলে নতুন বাংলাদেশে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলার জন্য এই রমজান থেকে শপথ নিবো। আমরা আশা করছি আগামীর বাংলাদেশ হবে সুখী, সমৃদ্ধ সুন্দর বাংলাদেশ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য দোয়া করি ও স্বাগত জানাচ্ছি। চট্টগ্রামের ১৬ জন সংসদ সদস্য মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে চট্টগ্রামকে সাজাতে চাই। চট্টগ্রামের ছেলে হিসেবে আগামীতে চট্টগ্রামকে দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যেটি আমি নির্বাচনী ওয়াদা দিয়েছিলাম। জলাবদ্ধতার নিরসনে বির্জাখাল খনন করেছিল জামায়াতে ইসলামী। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের হাত ধরে গতবছর জলাবদ্ধতা কমে এসেছিল।
সভাপতির বক্তব্যে মহানগরীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, রমজানের রহমতের দশক শেষে আজ মাগফিরাত দশকের প্রথমদিন। মজলুম ফিলিস্তিনের পক্ষে অকুতোভয় নেতৃত্ব আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাহাদাতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তির অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম দিন আজ। দেড়যুগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দ্বিতীয় রমজান পালন করছি আমরা। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সকল শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। রমজান শুরুর প্রাক্কালেই গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। সরকারি দল ও বিরোধীদলের সম্মিলিত প্রয়াসে নতুনভাবে রচিত হোক বাংলাদেশের ইতিহাস-সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেট সত্ত্বেও জুলাই সনদকে আইনি মর্যাদা দিতে যে জটিলতার সৃষ্টি করা হয়েছে তার অবসান হোক, জুলাই সনদের ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হোক-সেটাই গণআকাঙ্খা।
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ৪১ জন কাউন্সিলর, সংরক্ষিত আসনে ১৪ জন মহিলা কাউন্সিলরসহ নির্বাচিত মেয়রের নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। অনির্বাচিত প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্ব জটিলতাই সৃষ্টি করবে এবং নগরবাসীর নাগরিক সেবা বাধাগ্রস্ত হবে। অবিলম্বে এর অবসান হোক। বাণিজ্যিক রাজধানীর মানোন্নয়নে সকলের সম্মিলিত প্রয়াস আশা করছি। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের বিষয়ে জিরোটলারেন্স নীতি মেনে চলার জন্য সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করছি। আমরা চাই শান্তির নগরী ও উন্নয়নের নগরী।
মহানগরী আমির বলেন, রমজানের মূল শিক্ষা আল্লাহ্কে ভয় করে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে দায়িত্ব পালন। রাজনৈতিক, প্রশাসনিকসহ সর্বস্তরের নেতৃত্বে মৌলিক এ গুণটি অর্জিত হলেই জনগণের আমানতদারিতা শতভাগ রক্ষিত হবে। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাওফিক দিন। আমিন।

এতে আরও উপস্থিত ছিলেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেন, চট্টগ্রাম-৯ আসনের এমপি আবু সুফিয়ান, আইআইইউসি উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী, প্রোভিসি ড. অধ্যাপক হাসমত আলী, পোর্টসিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক আহসানুল্লাহ, চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যক্ষ আমিরুজ্জামান, অধ্যক্ষ নুরুল আমিন চৌধুরী, উত্তর জেলা আমীর মুহাম্মদ আলা উদ্দিন সিকদার, দক্ষিণ জেলা সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা বদরুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, মোহাম্মদ উল্লাহ, ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস, মহানগরীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মোহাম্মদ মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী, চাকসু ভিপি ইব্রাহিম রনি, মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. একেএম ফজলুল হক, ডা. সিদ্দিকুর রহমান, মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান, ছাত্রশিবির মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাইমুনুল ইসলাম মামুন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে শায়খুল হাদীস আল্লামা আলী উসমান, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েয়ে আমির আব্দুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি মাওলানা এমদাদুল্লাহ সোহাইল, বাংলাদেশের নেজাম ইসলাম পাটির মহানগর আমীর মাওলানা জিয়াউল হোসাইন, খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি অধ্যাপক খোরশেদ আলম, বাংলাদেশ জাতীয় গণতান্ত্রিক পাটির মহানগর সভাপতি আবু মোজাফফর মুহাম্মদ আনাস, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) মহানগর সেক্রেটারি জাফর আহমদ চৌধুরী, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) মহানগর আহবায়ক এডভোকেট গোলাম ফারুক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পাটির (বিডিপি) মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক এড জোবাইর মাহমুদ, লেবার পার্টির মহানগর সহ-সভাপতি মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি আবসার উদ্দিন, দৈনিক কর্ণফুলী পত্রিকার সম্পাদক আলহাজ্ব আফছার উদ্দিন চৌধুরী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উপস্থিত ইঞ্জিনিয়ার মানজারে খোরশেদ, ইঞ্জিনিয়ার মো লোকমান, ডা. জাহাঙ্গীর আলম, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম, এডভোকেট কফিল উদ্দিন, এডভোকেট শামসুল আলম, এডভোকেট কবির আহমদ, ডা. মুহাম্মদ ইউসুপ, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সেক্রেটারি গোলাম মাওলা মুরাদ, বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন অধ্যাপক লিয়াকত আকতার সিদ্দিকী, মাওলানা মমতাজুর রহমান, অধ্যক্ষ মাওলানা জাকের হোসাইন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী, সাইফুল্লাহ মনসুর প্রমুখ।