কাতার ফেরত মানব চক্র নিয়ামতের জাল! ‘ভিসা ফাঁদ’ জমা নথিতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে শীর্ষ প্রতারক চক্র এখন আত্মগোপনে! অনুসন্ধান বলছে রাতারাতি দেশের বাইরে
বিশেষ অপরাধ প্রতিবেদক | ঢাকা টু চাঁপাইনবাবগঞ্জ! এসএম রুবেল অনুসন্ধানী প্রতিবেদক-ইনভেস্টিগেশন টিম ক্রাইম সিন ইউনিট- চাঁপাইনবাবগঞ্জ মিডিয়া- সেল | গণমাধ্যম ২৩ জুন, ২০২৬ খ্রি.
সাম্প্রতি বিদেশ যাওয়ার রঙিন স্বপ্নকে পুঁজি করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক রোমহর্ষক ও ভয়ংকর জালিয়াত চক্রের সন্ধান মিলেছে। কাতার থেকে ফিরে এসে বৈধ ট্রাভেল ব্যবসার আড়ালে আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও জাল ভিসার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন! চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার আওতাধীন দারিয়াপুর কালোপুর নিয়ামত আলি (পিতা: মোয়াজ্জেম)। রাজধানীতে গড়ে তোলা গুলশান-বারিধারা সংলগ্ন নতুন বাজার ও কোকাকোলা মোড়ের ‘জে ব্লকে’ বিলাসবহুল অফিস খুলে নির্বিঘ্নে চালানো হচ্ছে এই প্রতারণা। বর্তমানে ভুক্তভোগীদের তীব্র চাপ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মুখে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে মানব পাচারকারীর চক্রের অন্যতম মূলহতা! এই শীর্ষ প্রতারক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে বলে অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে। চটকদার বিজ্ঞাপন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির আড়াল! আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এশিয়া এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে সুপরিচিত ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান দাবি করে "নিয়ামত এন্টারপ্রাইজ" ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন ছাড়ে। বেলারুশ, ইরাক, কম্বোডিয়া, সার্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের রানিং ফাইল জমা নেওয়ার নামে তারা সাধারণ মানুষের পাসপোর্ট ও টাকা হাতিয়ে নেয়। যোগাযোগ নিশ্চিত করতে তারা +880 এইসব 1826-762052 নম্বরটি ব্যবহার করে আসছিল। কাতার থেকে বিতাড়িত হয়ে আদম ব্যবসায় রাজকীয় আত্মপ্রকাশ! অনুসন্ধান ও সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত নিয়ামত আলি ২০০৯ সাল থেকে কাতারে প্রায় ১৩ বছর প্রবাসী হিসেবে কাটান। সেখানে স্বর্ণের (গোল্ড) চোরাচালান ও অবৈধ ব্যবসা করতে গিয়ে প্রশাসনের হাতে ধরা খেয়ে সব হারিয়ে দেশে ফেরত আসেন।
দেশে এসে কোনো পুঁজি না থাকায় তিনি রাজধানীর শীর্ষ আদম ব্যবসায়ী মামুনের হাত ধরে মানব পাচার ও আদম ব্যবসার অন্ধকার জগতে পা রাখেন। এরপর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (DNCC) থেকে একটি সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স (নাম্বার: TRAD/DNCC/023537/24/25) সংগ্রহ করে ঢাকার ভাটারা এলাকার নতুন বাজার জে ব্লকের ২ নম্বর রোডের ১২ নম্বর বাড়িতে ‘নেয়ামত আলি এন্টারপ্রাইজ ট্রাভেল এজেন্সী (টিকেটিং)’ নামে একটি চাকচিক্যময় বিলাসবহুল অফিস খোলেন। এই ভুয়ো অফিসের আড়ালেই শুরু হয় কোটি কোটি টাকার জাল ভিসা বাণিজ্য। এমনকি তার হাত থেকে কবিরুল নামে এক ব্যক্তি রক্ষা পায়নি এই জাঁদরেল প্রতারক থেকে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, নিয়ামত আলির প্রতারণার জাল এতটাই নিষ্ঠুর যে, তার প্রথম শিকার হন তার নিজের আপন খালাতো ভাই কবিরুল। তাকে ফ্রান্সে পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে জাল ভিসা ও ভুয়া নথিপত্র দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন নিয়ামত। আত্মীয়তার পবিত্র সম্পর্ককে পুঁজি করে এমন জঘন্য জালিয়াতির! মাধ্যমে পাওয়া টাকা দিয়ে নিয়ামত তার স্ত্রীর নামে এবং বেনামে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতায় অত্যন্ত মূল্যবান ৭ কাঠা জমি কিনে রেখেছেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।
লাওস ও সৌদি আরবের ভুয়া ভিসায় লোটি কোটি টাকা লোপাট করে!।শুধু নিজের আত্মীয়-স্বজনই নয়, নিয়ামতের জালিয়াতের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। তার প্রতারণার দুটি বড় প্রমাণ নিচে দেওয়া হলো! লাওসের নামে জন প্রতি ৫ লাখের কোপ, ২৩৫ টি ভিসা প্রসেসের ফাইল জমা নেয় এই শীর্ষ প্রতারক মানব পাচারকারী নিয়ামত বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মর্দানা এলাকার এক নিরীহ ও দরিদ্র মানুষকে লাওসের জাল ভিসা দিয়ে নগদ ৯ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন নিয়ামত। পরবর্তীতে সেই ভিসা সম্পূর্ণ জাল প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগী পরিবারটি ঋণের সাগরে ডুবে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।।সৌদি আরবের ‘ভুয়া’ ভিসায় ২৪ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ! চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার চকঝগরু গ্রামের রাসেলসহ ওই এলাকার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন যুবককে সৌদি আরবের জাল ভিসা সরবরাহ করেন নিয়ামত। সৌদিতে ভালো বেতনের লোভ দেখিয়ে তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে এককালীন ২৪ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
‘সিন্ডিকেটের নেপথ্য মানব পাচারকারী নিয়ামতের! গডফাদার! শীর্ষ জালিয়াত মাজহারুল, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিয়ামত আলির এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল গডফাদার এবং নেপথ্যের কারিগর হলেন ঢাকার শীর্ষ প্রতারক মাজহারুল। এই মাজহারুলের বাড়িও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর এলাকায়। তিনি মূলত বিভিন্ন দেশের জাল ভিসা তৈরি, পাসপোর্টে ভুয়া স্টিকার ও সিল মারার মূল টেকনিক্যাল কারিগর। ঢাকার নতুন বাজার জে ব্লক এরিয়াতে এই সিন্ডিকেটের প্রায় ২০০-এর উপর ভুঁইফোড় অফিস ও দালাল রয়েছে, যারা গ্রামীণ এলাকার সহজ-সরল মানুষকে ফাঁদে ফেলে ঢাকায় নিয়ে আসে। ফ্রি ভিসা সংগ্রহ ও ৫ লক্ষ টাকায় বিক্রির চাতুরতা! অভিযোগে জানা গেছে, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের রিক্রুটিং এজেন্সি ও সৌদি এমবাসির কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য আসা অত্যন্ত কম মূল্যের বা বিনামূল্যে পাওয়া 'মিসকিন ও ফ্রি ভিসা' অবৈধভাবে কালেকশন করে এই চক্র। এরপর দেশের সর্বাঞ্চলে নিয়ামতের দালালেরা সক্রিয় হয়ে সেই ফ্রি ভিসাগুলোকে 'উচ্চ বেতনের নিশ্চিত চাকরি' হিসেবে প্রচার করে প্রতি পিস ৫ লক্ষ টাকা করে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেয়।
প্রতারক নিয়ামতের 'বিশ্বস্ত সহযোগী ও ব্যাংকিং লেনদেনের গোপন মাধ্যম 'সাইফুল' নিয়ামত আলির এই অবৈধ অর্থ পাচার ও ব্যাংকিং কার্যক্রমের মূল সাক্ষী ও চালিকাশক্তি হলো তার অফিসের বিশ্বস্ত পিয়ন সাইফুল। সাইফুলের মাধ্যমেই ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া নগদ টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া, তোলা এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করার সমস্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হতো ' তবে! আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাইফুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এই চক্রের সমস্ত গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হদিস মিলবে। বিশেষ করে রয়েছে তার নামে একাধিক মামলা! পিবিআই ওরেন্টভক্ত আসামী। জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও ভুক্তভোগীদের জোর দাবি! চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালোপুর গ্রামের এই কুখ্যাত মানব পাচারকারী বর্তমানে এলাকাছাড়া। ভুক্তভোগী রাসেল, কবিরুল ও মর্দানা এলাকার সাধারণ মানুষ এখন সর্বস্বান্ত। জমিজমা বিক্রি করে ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা নিয়ামতকে টাকা দিয়েছিলেন। জনমনে এখন তীব্র ক্ষোভ। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের জোর দাবি—প্রশাসন যেন অবিলম্বে এই আন্তর্জাতিক প্রতারক ও মানব পাচারকারী নিয়ামত আলি এবং তার গডফাদার মাজহারুলকে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে গ্রেফতার করে। তাদের কঠোরতম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাসহ ভুক্তভোগীদের রক্ত জল করা আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধার করে ফেরত দেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আকুল আবেদন জানানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও সরকারের করণীয়: জনশক্তি রপ্তানিতে প্রয়োজন আমূল পরিবর্তন দেশের শিল্প খাতে রেমিটেন্স যোদ্ধাদের মূল্যায়ন করতে হবে সেই সাথে তাদের নিরাপত্তা শক্তি দেশ জুড়ে গড়ে উঠা প্রতারকদের উচ্ছেদ করার জন্য সরকারি জরুরী পদক্ষেপ ও মন্ত্রিসভায় বৈঠক টেবিল! অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা এ ধরনের ভয়ংকর প্রতারণা ও মানব পাচার বন্ধ করতে হলে এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও সাঁড়াশি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট লাইসেন্সধারী এবং অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির (RL Recruiting Agency) মাধ্যমে সরাসরি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি করা হলে ঢাকায় অবৈধভাবে বিলাস বহুল অফিস নিয়ে অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠা এসব দালাল ও প্রতারকদের বেপরোয়া সিন্ডিকেট এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে যাবে। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের জোর দাবি, এই চক্রগুলোর শিকড় উপড়ে ফেলতে সরকারের এখনই সময় এসেছে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে সরাসরি সাঁড়াশি অভিযান (Combative Drive) পরিচালনা করা। গ্রামগঞ্জের সরল মানুষদের ফাঁদে ফেলা এসব অবৈধ দালাল ও ছদ্মনামধারী ট্রাভেল এজেন্সির মালিকদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের মাধ্যমে তাদের কঠোরতম ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এবং ভুক্তভোগীদের আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধার করার স্থায়ী ব্যবস্থা না করা হলে, দেশের রেমিট্যান্স খাত ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার চরম হুমকির মুখে পড়বে।
এই মন্তব্যে পরিষ্কার করা হয়েছে যে, নিয়ামত বা মাজহারুলের মতো প্রতারকরা কেন পার পেয়ে যাচ্ছে। কারণ, ঢাকার অলিতে-গলিতে কোনো রকম জবাবদিহিতা ছাড়া ভুঁইফোড় অফিস গজিয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান কেবল নিয়ামতকে ধরা নয়, বরং পুরো জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়াকে নির্দিষ্ট আর এল (RL) রিক্রুটিং এজেন্সির অধীনে এনে স্বচ্ছ করা। প্রক্রিয়াটি নিয়মতান্ত্রিক হলে দালালেরা এমনিতেই ব্যবসা হারাবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষামন্তব্যের শেষ অংশে একটি বড় সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের প্রতারণার কারণে সাধারণ মানুষ যখন নিঃস্ব হয়, তখন তারা বৈধ পথে টাকা পাঠানোর ক্ষমতা বা ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে। ফলে দেশের রেমিট্যান্স খাত! ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এটি প্রমাণ করে যে, এই অপরাধটি শুধু কয়েকজন ব্যক্তির ক্ষতি করছে না, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে।