চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি:
আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে সারা দেশে এখন তীব্র জ্বালানি সহায়ক গ্যাস,তেল ও জ্বালানি যন্ত্রাংশের উপরে সরকার কঠোর নজরদারি ও রিজার্ভ বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে চলমান রয়েছে প্রশাসনের অভিযান।
এর মধ্যেও বিগত সরকারের দোসর ও কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আব্দুর শুক্কুর প্রকাশ তেল শুক্কুর আবারও বোল পাল্টে অনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পাওয়া গেছে।
কর্ণফুলী এখন এক অদৃশ্য তেল-অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছে ঐ দোসর হিসেবে পরিচিত তেল শুক্কুর।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত হলেও কর্ণফুলী এলাকায় সেই নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি এবং এর অধীনস্থ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপো থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দরে আগত দেশি-বিদেশি জাহাজ—সব জায়গা থেকেই কৌশলে তেল সংগ্রহ করছে এই চক্রটি।
আইন যেখানে ব্যক্তি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি বা বাজারজাতের কোনো সুযোগ রাখেনি, সেখানে এই সিন্ডিকেট দিন-রাত নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অবৈধ কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন নোঙর করে অসংখ্য জাহাজ, যেগুলো অনেক সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি বহন করে। এই অতিরিক্ত তেল গোপনে কম দামে বিক্রি করা হয় স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে। কোনো ধরনের শুল্ক বা সরকারি প্রক্রিয়া ছাড়াই এসব তেল দেশে প্রবেশ করায় সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। একই সঙ্গে কম দামে বিক্রির কারণে বৈধ বাজার ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই অবৈধ বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘তেল শুক্কুর’—যিনি দুই দশক আগে ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক—বর্তমানে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক। কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে তার প্রাসাদচুম্বী বাড়ি, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে অন্তত ১৭ জন চিহ্নিত অপরাধী রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে তেল চোরাচালান, চাঁদাবাজি, হামলা ও নির্যাতনের একাধিক মামলা রয়েছে। তবুও তারা থেকে যাচ্ছে আইনের নাগালের বাইরে।
শুক্কুরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় রয়েছে বহু মামলা, অভিযোগ ও জিডি। চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চাঁদাবাজি মামলা সিআর ৪৪/১৭, বন্দর থানার জিআর মামলা নং ২১৫৫/৯৬, পটিয়া থানায় ০১/৯৬, কর্ণফুলী থানার জিআর মামলা নং ১০/২০০২, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মামলা নং ১২২/আদেশ নং ১৫, কর্ণফুলী থানার মামলা নং ০১/২০০৯, বন্দর থানা মামলা নং ২২/৯৬। এ ছাড়া হত্যা ও হুমকির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে ১৮ ডিসেম্বর করা কর্ণফুলি থানায় পিপিআর নং ১৬২৭, জিডি ও অভিযোগ ২২/৯৬, ১৭৮১/১৬, পতেঙ্গা থানার পিপিআর নং ২১৯৩, ২০১৭ সালের ৯ মার্চ পিপিআর নং ৩৬০/১৭। তার আপন ভাইও ২০১৬ সালে শুক্কুরের বিরুদ্ধে জিডি করেন কর্ণফুলী থানায়, পিপিআর নং ১৭৮১।।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির বৈধ ঠিকাদারদেরও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করতে দেওয়া হয় না। জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের লোকবল দিয়ে তেল খালাস ও পরিবহন সম্পন্ন করা হয়। পতেঙ্গা গুপ্তখাল ডিপো থেকে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক কার্যত একটি সমান্তরাল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লিটার তেল হাতবদল হচ্ছে। জাহাজ থেকে প্রতি লিটার ৫০–৫৫ টাকায় সংগ্রহ করে তা পাইকারদের কাছে ৬০–৭০ টাকায় বিক্রি করা হয়। ফলে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেটটি আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
এই দূরদর্শী তেল চোরদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিশাল ক্ষতি সাধন করবে বলে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য। তাই এই চোর চক্রের সন্ধান নিয়ে অচিরেই আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসীরা।