নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে প্রতিনিয়ত নতুন আলো ছড়াচ্ছেন শাম্মী তুলতুল—একটি নাম, যা আজ শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সমানভাবে আলোচিত। সৃজনশীলতা, বহুমাত্রিক প্রতিভা এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন শক্তিশালী লেখক ও কথাসাহিত্যিক হিসেবে।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভাবান লেখিকার শৈশব কেটেছে নানামুখী সাংস্কৃতিক চর্চায়—নাচ, গান, আবৃত্তি, খেলাধুলা ও লেখালেখিতে। ছোটবেলায় দুষ্টু-ডানপিটে স্বভাবের হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন পরিপূর্ণ সাহিত্যসাধক। লেখালেখির প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাকে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
শাম্মী তুলতুল একাধারে লেখক, উপন্যাসিক, গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক, রেডিও অনুষ্ঠান পরিচালক, খবর পাঠিকা, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, ভয়েস প্রেসেন্টার, দাবাড়ু ও মডেল। ছোটবেলা থেকেই দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক—কালের কণ্ঠ, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ইত্তেফাক, খোলা কাগজ, প্রতিদিনের সংবাদ, মানবকণ্ঠ, আজাদী, পূর্বকোণসহ শিশু ও নবারুণ পত্রিকায় নিয়মিত লিখে আসছেন তিনি।
শুধু দেশেই নয়, তার লেখনী পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। জার্মানি, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউইয়র্ক ও প্যারিসভিত্তিক বাংলা পত্রিকায় নিয়মিত লেখার মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে বাংলা সাহিত্যকে তুলে ধরছেন। তার লেখা ইতোমধ্যে ভারতের গবেষণাকর্মেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তার সাহিত্যিক শক্তিমত্তার স্বীকৃতি বহন করে।
একটি সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা ও দেশপ্রেমিক পরিবারে জন্ম শাম্মী তুলতুলের। তার দাদা আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন লেখক, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা এবং কাজী নজরুল ইসলাম-এর বাল্যবন্ধু। নানী কাজী লতিফা হক বেগম ছিলেন স্বনামধন্য লেখক এবং নানা ডাক্তার কাজী এজহারুল ইসলাম ছিলেন দৌলত কবির বংশধর। তার বাবা আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা এবং মা কাজী রওশন আখতার ছিলেন সমাজসেবক। এমন একটি সমৃদ্ধ পারিবারিক পরিবেশ তার সাহিত্যচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৬টি। ২০২২ সালের কলকাতা বইমেলায় তার গল্পগ্রন্থ নরকে আলিঙ্গন প্রকাশিত হয়, যা বর্তমানে ভারতের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম Flipkart-এ পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালের বইমেলায় তার ১৭তম বই গল্পে স্বপ্নে জিব্রাইল (আঃ) প্রকাশিত হয়েছে অনিন্দ্য প্রকাশনী থেকে।
তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে চোরাবালির বাসিন্দা, পদ্মবু ও মনজুয়াড়ি, ভূত যখন বিজ্ঞানী, গণিত মামার চামচ রহস্য এবং পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ—যেগুলো পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য তার লেখা গল্পগুলো শিক্ষণীয় বার্তায় সমৃদ্ধ। তার গল্প পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ দীপ্ত টিভিতে নাটক হিসেবে প্রচারিত হয়েছে এবং লাল শরবত সিটি এফএম-এ সম্প্রচারিত হয়েছে।
শাম্মী তুলতুল প্রতিটি বইয়ে শিক্ষণীয় বার্তা অন্তর্ভুক্ত করেন, যাতে পাঠকরা বিনোদনের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা লাভ করতে পারেন। সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
তার সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ড, মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড, সাউথ এশিয়া গোল্ডেন পিস অ্যাওয়ার্ড, নজরুল অগ্নিবীণা সাহিত্য পুরস্কার, দাদা সাহেব ফালকে অ্যাওয়ার্ড (ভারত), সোনার বাংলা সাহিত্য সম্মাননা, রোটারি সম্মাননা, উইমেন পাওয়ার লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, ময়ূরপঙ্খী স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, রফিকুল হক দাদুভাই শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০২৬ এবং সেরা লেখক সম্মাননা ২০২৬। খাগড়াছড়ির পাঠকরা ভালোবেসে তাকে রাজকন্যা উপাধিতে ভূষিত করেছেন, এবং সেখানে পরপর দুইবার তার একক বইমেলার আয়োজন করা হয়।
রেডিওতে নিয়মিত খবর পাঠ এবং টেলিভিশনে আবৃত্তির পাশাপাশি তিনি সম্প্রতি বেগম রোকেয়া-এর চরিত্রে একটি ম্যাগাজিনের কাভার মডেল হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া আমাদের আইডল। তার চরিত্রে মডেল হতে পেরে একজন লেখক হিসেবে আমি গর্বিত।
নিজের শৈশব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ছোটবেলায় মায়ের কাছে ও দাদার কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে বড় হয়েছেন। সেই থেকেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ক্লাব ম্যাগাজিনে। এরপর নিজের নাম বড় অক্ষরে ছাপা হতে দেখে লেখালেখির প্রতি আরও অনুরাগ তৈরি হয়। যদিও পড়াশোনায় কিছুটা ফাঁকিবাজ ছিলেন, তবুও তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে এলএলবি অধ্যয়ন করছেন।
তার ভাষায়,ইচ্ছাশক্তি প্রবল না হলে সফল হওয়া সম্ভব নয়।সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের লক্ষ্যে—বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরার স্বপ্ন নিয়ে।
শাম্মী তুলতুল আজ শুধু একজন লেখক নন, তিনি একটি প্রেরণার নাম যিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস থাকলে বিশ্বমঞ্চেও নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।